ইউএনওদের নিরাপত্তার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৪, ২০২০

ইউএনওরা উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড তদারকি, সমন্বয় সাধন, সরকারের নীতি ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে মূখ্য ভূমিকা পালন করে থাকেন। মোবাইল কোর্ট ও টাস্কফোর্স অভিযান পরিচালনা, উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনা, সায়রাত মহাল ব্যবস্থাপনা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থাপনা ও তত্ত্বাবধান, সরকারি ও রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানসমুহ বাস্তবায়ন ইত্যাদি কাজে প্রতিনিয়ত নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন করেন। উপজেলা পরিষদের কার্যক্রম পরিচালনা ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নেও ইউএনওরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকেন। ফলে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে মতভিন্নতার মধ্যেও তাদের অনেক কাজ করতে হয়। জেলাপ্রশাসক সম্মেলন-২০১৮ এর মুক্ত আলোচনায় ডিসিরা ইউএনওদের নিরাপত্তার বিষয়ে দাবি তুলে ধরেন। এ প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী তাদের ব্যক্তিগত ও বাসভবনের জন্য পৃথক নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে নির্দেশ দেন। এরপরে কেটে গেছে দু বছর। কিন্তু এখনও মেলেনি ইউএনওদের বাসার নিরাপত্তা। এরই মধ্যে গত বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) রাতে প্রশাসনের ইতিহাসে ঘটে গেছে এক মর্মান্তিক ঘটনা। দুর্বত্তদের হাতে হামলার শিকার হয়ে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলার নির্বাহী অফিসার ওয়াহিদা খানম। এ ঘটনার পর পুরো প্রশাসনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। দুই মন্ত্রণালয়ের মধ্যেও টনক নড়েছে। ইউএনওদের নিরাপত্তার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে বৃহস্পতিবারই ফাইল চালাচালি শুরু হয়েছে।

জানা যায়, ২০১৮ সালের জুলাই মাসে জেলা প্রশাসক সম্মেলনে কিশোরগঞ্জের ডিসির পক্ষ থেকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় প্রতি উপজেলায় এক প্লাটুন আনসার নিয়োগের প্রস্তাব করা হয়। এই প্রস্তাবের ধারাবাহিকতায় সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মুক্ত আলোচনায় বিভাগীয় কমিশনার ও ডিসিদের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে ইউএনওদের সার্বক্ষণিক শারীরিক ও বাসভবনের নিরাপত্তা প্রদানে জননিরাপত্তা বিভাগকে উদ্যোগ নেওয়ার নির্দেশ দেন। প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতির বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে গত ফেব্রুয়ারিতে জননিরাপত্তা বিভাগকে নির্দেশ দেওয়া হয়। এতে সাবেক এসডিওরা যে মর্যাদায় ব্যক্তিগত ও বাসভবনের নিরাপত্তা পেতেন ইউএনওদেরও একইভাবে নিরাপত্তা দিতে বলা হয়েছে। জননিরাপত্তা বিভাগে পাঠানো চিঠিতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ বলেছে, মাঠ প্রশাসনে ইউএনওরা প্রায় নিরাপত্তাহীন অবস্থায় মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেন। এর বাইরেও তারা বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ইউএনওদের পূর্বসূরি মহকুমা প্রশাসকদের (এসডিও-সাব ডিভিশনাল অফিস) গানম্যান ও বাসার জন্য হাউস গার্ডের ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু এসডিও পদটি বিলুপ্তির পর এই সুবিধাটি ইউএনওদের জন্য কার্যকর করা হয়নি। জননিরাপত্তা বিভাগ থেকে প্রতিটি উপজেলায় একজন পিসি/এপিসি (প্লাটুন কমান্ডার) এবং ৯ জন আনসার নির্ধারণ করে তাদের জন্য ১০০ কোটি ৬০ লাখ ৭১ হাজার ৪৩৮ টাকার একটি সম্ভাব্য ব্যয় অনুমোদনের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। জবাবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়, প্রস্তাবটি অনেক ব্যয়বহুল। আনসার নিয়োগের মাধ্যমে ইউএনওদের শারীরিক ও বাসভবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না। তাদের সাবেক সাবডিভিশনাল অফিস (এসডিও) আমলের নিরাপত্তা সুবিধা, অর্থাৎ পুলিশ গানম্যান ও বাসভবনের জন্য পুলিশ হাউস গার্ড দেওয়া প্রয়োজন।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, পুলিশ নিয়োগের প্রস্তাবটিও ব্যয়বহুল। কারণ, প্রতিটি উপজেলায় কমপক্ষে একজন পুলিশ গানম্যান এবং তিনজন পুলিশ হাউস গার্ড নিয়োগ দিতে হবে।  আনসার সদস্যদের চেয়ে পুলিশের বেতনও বেশি। এছাড়া পুলিশ নিয়োগ করলে দুই মন্ত্রণালয়ের বাজেট বরাদ্দের মধ্যেও জটিলতা তৈরি হবে। এমন মতবিরোধের মধ্যে ২০১৯ সালের ২৩ অক্টোবর বিষয়টি নিয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে পুলিশের মাধ্যমেই ইউএনওদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টিতে জোর দেওয়া হয়েছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের ৩০ অক্টোবর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বলা হয়। কিন্তু এরপরও প্রায় এক বছর কেটে গেলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অবশেষে বুধবার এ হামলার পর টনক নড়েছে প্রশাসনে। জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন বলেছেন, ইউএনওর উপর কারা হামলা করেছেন তা খুব দ্রুতই জানা যাবে। হামলার জট অতি অল্প সময়ের মধ্যে খুলবে। এরপর এবিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।  সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার বলেন, ইউএনওদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। তাদের নিরাপত্তায় পুলিশ অথবা আনসার যে কোন বাহিনী দিয়ে করা যেতে পারে। তিনি বলেন, আমরা যখন মাঠ প্রশাসনে কাজ করেছি তখন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ছিল না। এখন সারাবিশ্বে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড অনেক বেড়েছে। এতে ইউএনওরা মাঠ প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা হিসেবে নানা ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছে।