বদলে গেছে ডিজিএনএম-এর চেহেরা!

প্রকাশিত: জুন ৭, ২০২০

বদলি বাণিজ্য বন্ধে নজিরবিহীন পদক্ষেপ নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরেরঃ নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত যে প্রতিষ্ঠানের গায়ে বদলি বাণিজ্যের তকমা ছিল কয়েক মাস আগেও।

দশম গ্রেডের কর্মকর্তা একজন নার্স, ১৬হাজার টাকার স্কেলে একজন কর্মকর্তা আর কতইবা মাসিক বেতন পান? ধরেন, কেটেকুটে ২০ হতে ২৫ হাজার টাকা। এ বেতন দিয়ে বাসা ভাড়া, বিদ্যুত বিল, গ্যাস বিল, পানির বিল, পোশাক পরিচ্ছদ, সন্তানের শিক্ষা খরচ, ইন্টারনেট খরচের সাথে মাসিক খাওয়া দাওয়া ও সাংসারিক খরচ মেটাতে নার্সদের জীবন যখন ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা, তখন এক শ্রেণির দালাল ও নার্সিং নেতা গড়ে তুলেছেন বিশাল বদলি বাণিজ্য সিন্ডিকেট ।

এ সিন্ডিকেটের কাজ হজ্জ মিশন, উচ্চ শিক্ষায় বিদেশ গমন বা বিদেশ প্রশিক্ষণ, হাসপাতাল কেন্দ্রিক মাসিক চাঁদা, ইনক্রিমেন্টে, টাইম স্কেল, শ্রান্তি ও বিনোদন ভাতা, সিলেকশন গ্রেড ও বেতন ফিক্সেশনে কিংবা পদোন্নতি পেতে মোটা অংকের চাঁদা আদায় করা। তবে সব কিছু ছাড়িয়ে সিন্ডিকেটের মূল টার্গেট বদলি বাণিজ্য ।

প্রতিটি বদলি হতে এক লাখ হতে দুই আড়াই লাখ টাকা রেট ছিলো কয়েকদিন আগেও। এ জন্য এই সিন্ডিকেটটি ডিও লেটার, ভূয়া ডিও লেটার, সুপারিশ, প্রভাবশালী ব্যক্তি বা আমলা দ্বারা, তদবির ও লবিংয়ে সারাক্ষণ ব্যস্ত রাখতেন অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের। কথা না শুনলে উল্টো পুরো দায় চাপাতো অধিদপ্তরের উপর।

অধিদপ্তর এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজসে এই অপকর্ম ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। এই চক্রটি তাদের মূল কাজ করতো নিয়োগের সময় । যেভাবে বা যে কারণে হোক না কেন, নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত নার্সদের নিজ উপজেলা, জেলা, বিভাগ বা পাশ্ববর্তী বিভাগ ছাড়িয়ে পদায়ন করা হতো শতশত কিলোমিটার দূরে, কোন দ্বীপ বা হাওরে । যেমন পটুয়াখালীর একজন মহিলা নার্সকে সিলেটের জকিগঞ্জে কিংবা রাজশাহীর একজন মহিলা নার্সকে টেকনাফ বা মহেশখালিতে প্রথম পদায়ন করা হয়। এ রকম শতশত নার্স আজ জীবিকার তাগিদে একপ্রকার দেশান্তরী ।

অবশ্য কোন কোন জেলা হতে বেশি নিয়োগ পাওয়ায় হয়তো দূরে পদায়ন হয়। তাই বলে এতো দূরে! বাংলাদেশের এক প্রান্তে বাড়ি আর আরেক প্রান্তে চাকরি। ফলে নার্সদের বিশেষ করে মহিলা নার্সদের জীবন হয়ে ওঠে দুর্বিসহ। অনেকে মা বাবা হতে বিচ্ছিন্ন, ভেঙ্গে গেছে অনেকের স্বামী-সংসার। ভবিষ্যতের কোন স্বপ্ন নেই, এমনকি প্রিয়জনের বা মা বাবার মৃত্যুর সময় শেষ দেখাও হয়না অনেকের। আর এ সুযোগটি কাজে লাগিয়ে বদলি বাণিজ্য করে যাচ্ছিল নার্স নেতা নামধারী ও সুবিধাবাদী সিন্ডিকেট ।

তিন বছর পর পর বদলি করার কথা থাকলেও এরা দশ হতে বিশ বছরও একই কর্মস্থলে থেকে নিয়ন্ত্রণ করে এই বাণিজ্য। অধিদপ্তরের দায়িত্ব নেওয়ার পর বর্তমান মহাপরিচালক ও পরিচালক বদলি সংক্রান্ত বিষয়টি সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে হয়রানি ও নির্ভেজাল করার করার উদ্যোগ নেন। তারা বদলি বাণিজ্যে বন্ধ করে দূরবর্তী স্থানে কর্মরত নার্সদের আবেদনের ভিত্তিতে স্ব-স্ব জেলা, বিভাগ বা পছন্দের স্থানে পদায়ন করতে শুরু করেন। আর ঐ সব স্থানে ঐ জেলার বা বিভাগের নার্সদের পদায়ন করতে শুরু করেন। ফলে যেখানে আগে ঘুরঘুর করতো দালাল চক্র, পাল্টে গেলো এখন সেখানকার দৃশ্যপট।

নার্সিং এন্ড মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরে প্রবেশে আরোপ করা হয়েছে এরই মধ্যে ব্যাপক কড়াকড়ি । বসানো হচ্ছে ডিজিটাল প্রবেশ সিস্টেম। যিনি জীবনে একবার ডিজিএনএম-এ প্রবেশ করবেন, তার নামে তৈরি হবে একটি অটো আইডি। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত একজন মানুষ যতবার ডিজিএনএম-এ আসবে, ততবারই তা অটোমেটিক রেকর্ড হবে। রেকর্ড হবে প্রবেশকারীর নাম, আগমনের উদ্দেশ্য, প্রবেশ এবং বের হবার সময় এবং যিনি অনুমতি দিলেন তার নাম। একই সঙ্গে রেকর্ড হবে সারাদিন, সপ্তাহ, মাস বা বছরে কতবার আসা যাওয়া করলো ডিজিএনএম-এ।

দালালি বা তদবির নিয়ে আগমনকারীদের ডিজিটাল মাধ্যমে ব্লক করা হবে আজীবনের জন্য। ডিজিএনএম-এর এই আমূল পরিবর্তনের পেছনে যে মানুষটি নিরলস কাজ করছেন, তিনি প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক(প্রশাসন, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ) ও উপসচিব মোহাম্মদ আব্দুল হাই, পিএএ। প্রতিষ্ঠানটিতে যোগদানের পর থেকেই নার্সিং সেবার মান শতভাগ নিশ্চিত করতে দিন-রাত একাকার করে পরিশ্রম করছেন এই সরকারি আমলা।

করোনা পরিস্থিতিত নার্সদের যাবতীয় সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছেন নিরলসভাবে। নার্সদের বেতন ভাতা, ঈদ বোনাস, শ্রান্তি বিনোদন ভাতার সমাধান করেছেন। নতুন অর্থ বছরে নার্সদের জন্য বরাদ্দ ৮০০ হতে ২১০০ কোটি টাকায় উন্নীত করেছেন। অর্থাৎ নার্সদের দুর্ভোগ ও দুরবস্থা লাঘবে নেয়া হয়েছে যুগান্তকারী সব পদ্ক্ষেপ। তবে সবচেয়ে কার্যকরী ও সফল উদ্যোগ হলো বদলিতে স্বচ্ছতা ও মানবিকতা আনয়ন।

রাজশাহীর নার্স যাদের পোস্টিং সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, কক্সবাজার, বরিশাল, ভোলা, টেকনাফ, রামু, নোয়াখালীর মতো দূরবর্তী স্থানে এবং বরিশালের যাদের পোস্টিং সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, কক্সবাজার, রংপুর, বগুড়া, দিনাজপুর চট্টগ্রামের মতো দূরবর্তী অঞ্চলে, তাদেরকে স্ব-স্ব জেলা-উপজেলায় পোস্টিংয়ের সিস্টেম চালু করে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছেন আব্দুল হাই পিএএ ।

ডিজিএনএম ঘিরে উঠতি দালালচক্র ইতিমধ্যে হয়ে পড়েছে কোনঠাসা। প্রতিষ্ঠানটির স্পষ্ট নির্দেশনা, কোনো মাধ্যম বা কারো ডিও লেটার ছাড়াই অধিদপ্তরে নার্সদের নিজের আবেদন নিজেকেই করতে হবে। অথচ এর আগে নিজ জেলায় পদায়নে নার্সদের হয়রাণির সুযোগ ছিলো। জামালপুরের জন্মস্থান হলেও সুলতানা পারভিনের পোস্টিং পিরোজপুরের ভান্ডারিয়ায়। দীর্ঘদিন চেষ্টা করেও নিজ এলাকায় যেতে পারেননি এই সিনিয়র স্টাফ নার্স। দালাল চক্রের চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় নিজের বাবা-মা এবং আত্মীয়-স্বজন থেকে অনেক দূরে কর্মস্থলে কাজ করে যাচ্ছিলেন তিনি। প্রত্যাশা অনুসারে নিজ জেলা জামালপুরে পদায়নের আদেশ পেয়ে আনন্দে কেঁদে ফেলেন এই সেবিকা। বলেন “কোন মন্ত্রী-এমপির সুপারিশ ছাড়াই এতো সহজে নিজ এলাকায় যেতে পারবো তা কল্পনাও করিনি”। এ রকম শত শত আবেগ আপ্লুত মন্তব্য এখন ফেসবুক প্রতিটি বদলি আদেশের পর।

কিন্তু এতসব নার্স বান্ধব উদ্যোগে যারপরনাই অখুশি দালাল চক্র। নিজেদের অনৈতিক দাবি আদায়ে ব্যর্থ হয়ে ডিজিএনএম এর কর্মকার্তাদের চরিত্রহননে উঠেপড়ে লেগেছে তারা। নামসর্বস্ব পত্রিকায় সংবাদ ছাপিয়ে এই উদ্যোগকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপতৎপরতায় লিপ্ত আছেন কেউ কেউ। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডিজিএনএম এর পরিচালক মোহাম্মদ আব্দুল হাই পিএএ বলেন, মূলতঃ করোনার মধ্য দায়িত্ব নিয়ে কাজ শুরু করছি ইতিবাচক পরিবর্তনের জন্য। যতই ষড়যন্ত্র হোক, দুষ্টুচক্রদের সাথে কোন আপোস নেই। নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরে স্বচ্ছতা আনার চেষ্টা অব্যাহত থাকবে। রোগীর সেবাই নার্সদের পাশে থাকার জন্য সবার আগে তাদের পারিবারিক ও সামাজিক ঝামেলা হতে মুক্ত করে সুন্দর পরিবেশে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। তিনি বলেন, নার্সরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে করোনায় আক্রান্ত রোগীদের সেবা দিতে গিয়ে নিজেরা আক্রান্ত হচ্ছে এবং এমনকি মৃত্যু বরণও করছে। তাহলে সুযোগ থাকা সত্ত্বেও নার্সদের নিজ জেলা বা বিভাগের বাইরে পদায়ন করার কোন হেতু নাই। আমরা নার্সদের বদলিতে কোন রকম হয়রানি, আর্থিক লেনদেন তথা বদলি বাণিজ্য করতে কাউকে সুযোগ দিবো না। এ বিষয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা’র দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়নে আমরা তথা নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তর এখন শতভাগ সতর্ক ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ । চরিত্রে কালিমা লেপনের কোন সুযোগ নেই। সুযোগ থাকবে না।

আর নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তর এর মহাপরিচালক ও সরকারের অতিরিক্ত সচিব জনাব সিদ্দিকা আক্তার হলেন এ সকল সফল উদ্যোগ গ্রহণ, বাস্তবায়ন ও কার্যকর করার মূল নিয়ামক। প্রশাসনের দক্ষ ও নিষ্ঠাবান কর্মকর্তাদের মাধ্যমেই দুর্নীতিমুক্ত সোনার বাংলা গড়া সম্ভব । আগামীর বাংলাদেশ হবে ভবিষ্যত প্রজন্মের সোনার বাংলা, ডিজিটাল বাংলাদেশ-তা আশা এখন করাই যেতে পারে।