“দ্য লাস্ট কিস” ঢাকা থেকে নির্মিত প্রথম নির্বাক পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র।

প্রকাশিত: মে ৭, ২০২০

ইস্ট বেঙ্গল সিনেমাটোগ্রাফ কোম্পানির প্রযোজনায় অম্বুজপ্রসন্ন গুপ্ত নির্মাণ করেন নির্বাক পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র “দ্য লাস্ট কিস”। ১৯২৭ সালের দিকে “দ্য লাস্ট কিস” -এর চিত্রগ্রহণ শুরু হয়। ঢাকা শহরের প্রাকৃতিক দৃশ্যসংবলিত “দ্য লাস্ট কিস” ছবির দৃশ্য ধারণ করা হয় মতিঝিল, দিলকুশা, শাহবাগ, নীলক্ষেত ও আজিমপুর বালিকা বিদ্যালয়ের কাছে নবাবদের বাগানে। এ ছবির চিত্রগ্রহণের কাজ শেষ হতে প্রায় এক বছর সময় লেগেছিল।

“দ্য লাস্ট কিস” ছবিতে নায়কের ভূমিকায় অভিনয় করেন ঢাকা নবাব পরিবারের সদস্য খাজা আজমল ও নায়িকার চরিত্রে অভিনয় করেন ললিতা বা লোলিটা বা বুড়ি। ললিতা ছিলেন বাদামতলী পতিতালয়ের একজন যৌনকর্মী, তখন তার বয়স ছিলো মাত্র চৌদ্দবছর।চারুবালা, দেববালা (দেবী) নামের আরও দুই যৌনকর্মী এতে অভিনয় করেন। হরিমতি নামে একজন অভিনেত্রীও এতে অভিনয় করেন। সিনেমার কাজ শেষে লোলিটা আবার তার আগের পেশায় ফিরে যান। সে আর কোন সিনেমায় কাজ করেনি, এমনকি এরপর তার আর কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি। এভাবেই হারিয়ে যায় আমাদের ইতিহাসের প্রথম নায়িকা!

ঢাকায় চলিচ্চিত্রটির শুটিং হলেও প্রিন্ট ও প্রসেসিং হয় কলকাতায়। ১২ রিলের ছবিটি ১৯৩১ সালে এই চলচ্চিত্র মুক্তি পায় ঢাকার মুকুল হলে (অধুনা আজাদ হল)। এর প্রিমিয়ার শো উদ্বোধন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার (১৮৮৮-১৯৮০)। পরে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (১৯৩৬-১৯৪২) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। রিলিজের সময় নির্বাক এ ছবি বাংলা, ইংরেজি ও উর্দু ভাষায় সাবটাইটেল করে দেওয়া হয়েছিল। প্রায় এক মাস এ ছবির প্রদর্শনী চলে।
ছবিটির প্রত্যক্ষ দর্শক ও তৎকালীন হকি ক্রীড়াবিদ খাজা মোহাম্মদ ইউসুফ রেজার অভিমত,এই ছবিতে বেশ্যা বাইজীদের নিয়ে ধনীদের মধ্যে যে সংঘর্ষ দেখানো হয়েছে ওই সময়ে তা ছিল নিত্য-নৈমিত্তিক ঘটনা। এ ছবির কাহিনী ছিল এক বাস্তব ঘটনারই রূপায়ন।

আফসোসের বিষয় হচ্ছে, এখন আর এই চলচ্চিত্রটির কোনো প্রিন্টের খোঁজ পাওয়া যায় না। ঢাকায় প্রদর্শন শেষে অধিকতর প্রচারের আশায় চলচ্চিত্রটিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল কলকাতায়। সেখানকার আরোর ফিল্ম কোম্পানি চলচ্চিত্রটি অত্যন্ত কম দামে কিনে রেখেছিল, কিন্তু এই ঐতিহাসিক সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণ তারা করেনি!


আরেকটি কথা, “দ্যা লাষ্ট কিস” সিনেমার আগে আম্বুজপ্রসন্ন গুপ্ত “সুকুমারী” নামে একটা স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন, চার রিল শুটিংয়ের পর আর শেষ হয়নি! “দ্যা লাস্ট কিস” আমাদের জানান দেয় চলচ্চিত্র নিয়ে আমাদের আবেদন ও সংস্কৃতিমনা এই মনোভাব নতুন কিছু না। পাশাপাশি বুঝিয়ে দেয় কট্টরপন্থী এ সমাজ ব্যবস্থার বেড়াজালে লুকিয়ে থাকা কিছু উদারমনা সংস্কৃতি প্রেমিকের হাত ধরে আধুনিকতার ছোয়া লাগার অনেক আগে থেকেই মানুষ চলচ্চিত্রকে নিজের মনে লালন করে আসছে এবং নিত্য নতুনভাবে সেটিকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। হয়তো ইতিহাস খুঁজলে এমন আরও অনেক চলচ্চিত্রের সন্ধান পাওয়া যাবে।