করোনার পরে আমাদের সম্ভাব্য করনীয়

প্রকাশিত: মে ৩, ২০২০

মুহিব্বুলাহ মুহিবঃ করোনায় স্থবির হয়ে পড়েছে বিশ্ব অর্থনীতি। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, করোনা উত্তর সময়ে এই পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ রূপ ধারন করবে। বাড়বে দারিদ্রতা, বন্ধ হবে অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান, চাকরি হারাবে কয়েক কোটি মানুষ। দারিদ্র্য-পীড়িত বাংলাদেশে দুর্ভিক্ষের শঙ্কা করছেন কেউ কেউ। সম্ভাব্য সংকট মোকাবেলায় প্রস্তুতি নিতে হবে এখনই। গ্রহণ করতে হবে যথাযথ পরিকল্পনা। সেই পরিকল্পনা শুরু করতে হবে এখনই।

করোনা শেষে যে কয়েকটি বিষয়ে সরকারকে জোর নজর দিতে হবে-

(১) সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফর আগামী দুই বছর বন্ধ করতে হবে। রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে যেতে হলে মিশনের মাধ্যমে সমন্বয় করে নূন্যতম সংখ্যক যাবে। রাষ্ট্রীয় চুক্তি ব্যতীত এক ব্যক্তি বছরে একবারের বেশি যেতে পারবে না।

(২) শিক্ষা সফর, অভিজ্ঞতা অর্জন, প্লান্ট/ফ্যাক্টরি পরিদর্শন, মত বিনিময়, তিনমাসের নিচে প্রশিক্ষণে গমন আগামী দুই বছর বন্ধ রাখতে হবে।

(৩) চিকিৎসা ব্যতীত বেসরকারি ব্যক্তিদের বিনোদন, প্রমোদ ভ্রমণ, ভিজিটর ভিসায় গমন বন্ধের ব্যবস্থা করতে হবে।

(৪) অভিবাসী কর্মীদের প্রেরণে উৎসাহিত করার জন্য গমনের ১৪ দিন পূর্বে করোনা টেস্ট নেগেটিভ রিপোর্ট প্রদান এবং বিমানবন্দরে গমনের সময় করোনা টেস্টেড সীল দিয়ে বিদেশে প্রেরণ করতে হবে। যাতে নিয়োগকারী দেশ সুরক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত হতে পারে। ফলে বিদেশে অধিক সংখ্যক কর্মী যেতে পারবে। অন্যথায় প্রবাসীদের আয়েও ভাটা পড়তে পারে ভবিষ্যতে।

(৫) ব্যবসায়ীক ও উচ্চ শিক্ষার কারণ ব্যতীত চীনে গমন আগামী দুই বছর নিষিদ্ধকরণ প্রয়োজন।

(৬) ইটালি এবং চীন হতে আগত যে কোন ব্যক্তি করোনা টেস্ট নেগেটিভ রিপোর্ট নিয়ে দেশে গমন করতে হবে এবং হজ্জ ক্যাম্পে বাধ্যতামূলক ১৪ দিন কোয়ারেন্টাইনে রাখার সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

(৭) গার্মেন্টস পণ্যের কন্টেইনারের গায়ে করোনা টেস্টেড সীল দিয়ে বিদেশ প্রেরণ করতে হবে।

(৮) প্রতিটি কৃষি জমি চাষের আওতায় আনার ব্যবস্থা করতে হবে। কৃষি যন্ত্রপাতি, সার, বীজ ও নগদ টাকা কৃষকদের প্রণোদনা দিতে দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

(৮) মৎস্য চাষ ও হ্যাচারি খাতে বিশেষ নজর দিতে হবে। পোল্ট্রি খাতে ঋণ ও প্রণোদনা বিকল্প নেই।

(৯) ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে বিনা জামানতে স্বল্প সুদে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা ঋণ দিতে হবে। এনআইডি, ব্যাংক হিসেব নাম্বার, কারখানা পরিদর্শন রিপোর্ট জামানতের আওতাভুক্ত করার ব্যবস্থা করতে হবে।

(১০) বৃহৎ শিল্পে কর হ্রাস ও প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় আনতে হবে।

(১১) আইসিটি খাতে বেকার যুবকদের মাসিক বৃত্তিসহ সর্বোচ্চ তিনমাস মেয়াদি প্রশিক্ষণ দিতে হবে।

(১২) রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন দিবসসমূহে ব্যয় কমাতে হবে। প্রয়োজনে কিছু দিবস পালনের ব্যয় শূন্যতে নিয়ে আসতে হবে।

(১৩) উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধি প্রকল্পের নামে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের বিশেষ করে কৃষি, আইসিটি, মৎস্য ও প্রাণীসম্পদ, স্থানীয় সরকার, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ, যুব ও ক্রীড়া, শিক্ষা, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক, ধর্ম এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ ইত্যাদি মন্ত্রণালয় ও অধীনস্থ দপ্তরে প্রকল্প সংখ্যা ব্যাপক পরিমানে কমিয়ে আনতে হবে।

(১৪) বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে কর রেহাত ও অন্যান্য সুবিধা ঘোষণা করতে হবে।

(১৫) চায়নাসহ বিভিন্ন দেশ হতে খেলনা, ইলেকট্রনিক্স পণ্য, বিলাস দ্রব্য, কসমেটিক্স, পোশাক, স্বর্ণালঙ্কার, দামী গাড়ি ইত্যাদি আমদানি আগামী দুই বছর বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিতে হবে ।

(১৬) শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধিক ক্লাস নিতে হবে এবং ছুটি কমিয়ে আনতে হবে।

(১৭) পর্যটকদের বাংলাদেশে আগমনের সাত দিন পূর্বে বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনে করোনা টেস্ট নেগেটিভ রিপোর্ট দাখিল করতে হবে এবং বাংলাদেশ বিমান বন্দরে চেক করতে হবে।

(১৮) ৬০ উর্ধ্ব সকল ব্যক্তিকে সামাজিক সুরক্ষা নেটওয়ার্কের আওতায় এনে মাসিক ভাতা দিতে নিশ্চিত করতে হবে

(১৯) ২৭ বছরের উর্ধ এবং ৪০ বছরের নিচে নূন্যতম বি.এ বা সমমানের পাশ বেকারদের মাসিক পাঁচ হাজার টাকা হারে বেকার ভাতা দেয়া যেতে পারে।

(২০) দেশের অভ্যন্তরে সভা, সেমিনার, ওয়ার্কশপে ব্যয় কমাতে হবে।

এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের এখনই উপযুক্ত সময়। এসব সিদ্ধান্ত গ্রহণে কালক্ষেপণ মানেই দেশের মানুষের দুর্দশা ও দুর্ভোগ মাথা পেতে গ্রহণ করার নামান্তর। সুতরাং এখনই সময়।

লেখক পরিচিতিঃ (সিনিয়র সাংবাদিক, বাংলাভিশন টিভি)