ই-কমার্স : বাংলাদেশে যে ব্যবসায়িক মডেল প্রচলিত

প্রকাশিত: অক্টোবর ১৭, ২০২১

আধুনিক ব্যবসার জগতে ই-কমার্স একটি উদীয়মান ও প্রতিশ্রুতিশীল খাত হিসেবে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। অ্যামাজন, আলিবাবা, দারাজের মতো ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলো বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সফলভাবে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছে। তথ্যপ্রযুক্তির উৎকর্ষ ও প্রযুক্তি ব্যবহারকারী মানুষের ক্রমাগত আগ্রহ এ খাতকে দ্রুত জনপ্রিয় করে তুলেছে।

বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও ই-কমার্স খাত দ্রুত প্রসার লাভ করেছে। বর্তমান সরকারের ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গড়ার লক্ষ্যে ব্যবসা-বাণিজ্যের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নতুন ও উন্নত প্রযুক্তিকে সম্পৃক্ত করার প্রয়াস এ খাতের বিকাশকে গতিশীল করেছে।

গত বছরের শুরুতে করোনার সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে সরকার ঘোষিত লকডাউনের সময় স্বাস্থ্যবিধি পরিপালন ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে গিয়ে মানুষ যখন অনেকটাই ঘরবন্দী হয়ে পড়েছিল তখন নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের কেনাকাটা করার জন্য ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এই সুযোগে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অনিয়ন্ত্রিতভাবে গড়ে ওঠে হরেক রকম ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান। চটকদার বিজ্ঞাপন ও লোভনীয় অফারের প্রলোভন দেখিয়ে এসব প্রতিষ্ঠান সহজেই মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে নেয়।

সম্প্রতি বেশ কয়েকটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের ইচ্ছাকৃত প্রতারণা বা অনিচ্ছাকৃত ব্যর্থতার খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে এই খাতের গ্রাহকদের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে ও আস্থার সংকট তৈরি হয়। ই-কমার্স নিয়ে গ্রাহকদের আস্থা ফেরাতে ও এই খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বিভিন্ন উপায়ের প্রস্তাবনা করেছেন। আজকের লেখায় আমি ভিন্ন বিষয়ের অবতারণা করব। বাংলাদেশের অধিকাংশ ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান যে ব্যবসায়িক মডেলের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণই এই লেখার মূল বিষয়।

সারা বছর ধরে অবিশ্বাস্য কম দামে পণ্য কিনতে পারার প্রস্তাবকে অনেক গ্রাহক দেখেছেন বিনিয়োগের সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে।
সাধারণ অর্থে ই-কমার্স বলতে আমরা অনলাইনে কেনাকাটা করাকে বুঝে থাকি। ই-কমার্সের সাথে জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রেতাদের অর্ডার অনুসারে পণ্য বা সেবা সরবরাহ করার প্লাটফর্ম হিসেবে কাজ করে। ক্রেতারা কম্পিউটার বা মোবাইলের পর্দায় পণ্যের ছবি দেখে ও বর্ণিত গুণাগুণ বিশ্লেষণ করে তাদের পছন্দকৃত পণ্য অর্ডার করে থাকেন।

প্রতিটি অর্ডারের বিপরীতে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলো অর্ডারকৃত পণ্য সংগ্রহ করে অথবা পূর্বে সংরক্ষিত পণ্যভান্ডার থেকে ক্রেতাদের সরবরাহ করে থাকে। কখনো ক্রেতারা পণ্য বুঝে পাওয়ার পর মূল্য পরিশোধ করেন, কখনো পণ্য অর্ডার করার সময় অগ্রিম মূল্য পরিশোধ করতে হয়।

অগ্রিম মূল্য পরিশোধের ক্ষেত্রে পণ্য সরবরাহ করার আগে পর্যন্ত পণ্যের মূল্য বাবদ গ্রহণকৃত নগদ অর্থ বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের দায় হিসেবে বিবেচিত হয়। শুধুমাত্র পণ্য সরবরাহ করার পরই অথবা ক্রেতা কর্তৃক পণ্য গৃহীত হওয়ার পরই বিক্রেতা দায়মুক্ত হয় এবং সম্পন্নকৃত লেনদেন থেকে আয় বা মুনাফা লিপিবদ্ধ করে। সহজ ভাষায় এটাই হচ্ছে, ই-কমার্সে বর্তমানে ব্যবহৃত ব্যবসায়িক মডেল। বাংলাদেশের ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোও প্রচলিত ও সর্বগ্রাহ্য এই মডেল অনুসরণ করে থাকে।

বাংলাদেশের ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলো উক্ত ব্যবসায়িক মডেলের সাথে বিশাল সংখ্যক ক্রেতা বা ভোক্তাকে আকর্ষণ করার উদ্দেশ্যে উচ্চহারে মূল্য ছাড়ের টোপ ব্যবহার করেছে। ডিসকাউন্ট বা ছাড়ে পণ্য বিক্রি যেকোনো ব্যবসায়ের স্বাভাবিক কার্যক্রমের অংশ। নতুন পণ্যের বাজার তৈরি করতে বা মজুদ পণ্যের দ্রুত বিক্রি নিশ্চিত করতে ছাড়ে পণ্য বিক্রি করা হয়।

অর্থনীতির সূত্র অনুসারে, পণ্যের দাম কমালে চাহিদা বৃদ্ধি পায়। তাই প্রতিযোগিতামূলক বাজারে অভাবনীয় মূল্য ছাড়ের লোভনীয় প্রস্তাব দিয়ে অধিক সংখ্যক ভোক্তাকে প্রলুব্ধ করে ব্যবসায়ের পরিধি বাড়াতে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলো মেতে উঠেছিল এক অসুস্থ প্রতিযোগিতায়।

মূল্য ছাড়ের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এই আক্রমণাত্মক ব্যবসায়িক মডেল অনেক সম্ভাব্য ক্রেতাকে ব্যবসায়ী বা বিনিয়োগকারীতে পরিণত করেছে। সারা বছর ধরে অবিশ্বাস্য কম দামে পণ্য কিনতে পারার প্রস্তাবকে অনেক গ্রাহক দেখেছেন বিনিয়োগের সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে।

ই-কমার্স পণ্য কেনাবেচার মাধ্যম। ক্রেতাদের জন্য এটা কোনোভাবেই বিনিয়োগের মাধ্যম হতে পারে না। তবুও কিছু সুযোগ সন্ধানী (কারো মতে লোভী) মানুষ অল্প সময়ে অধিক টাকা উপার্জনের লক্ষ্যে ই-কমার্সকে বেছে নিয়েছেন বিনিয়োগ মাধ্যম হিসেবে। এরা বিশাল মূল্য ছাড়ের প্রস্তাব লুফে নিয়ে কম দামে বেশি পরিমাণে পণ্য সংগ্রহ করে অন্যের কাছে বেশি দামে বিক্রি করে দ্রুততম সময়ে লাভবান হয়েছেন। এদের দেখে আরও অনেকেই ই-কমার্সকে বিনিয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে উৎসাহী হয়েছেন এবং একসাথে অনেক পণ্য অর্ডার করে অগ্রিম মূল্য পরিশোধ বাবদ বিশাল অঙ্কের টাকা লগ্নি করেছেন।

কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের প্রতারণা ও জালিয়াতির কারণে ই-কমার্সের মতো একটি বিপুল সম্ভাবনাময় খাতের পরিপূর্ণ বিকাশের পথে যে অন্তরায় সৃষ্টি হয়েছে তা দূরীভূত করতে যত দ্রুত সম্ভব এই খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে।
অপরদিকে অবিশ্বাস্য কম মূল্যে পণ্য বিক্রি করে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাপকভাবে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। এর সাথে যোগ হয়েছে কর্মীদের বেতন, বিজ্ঞাপনসহ ব্যবসায়ের দৈনন্দিন পরিচালনা খরচ। যার অনিবার্য পরিণতি আর্থিক সংকট।

আর্থিক সংকটে জর্জরিত প্রতিষ্ঠানগুলো পণ্য সরবরাহকারীদের পাওনা যথাযথ সময়ে পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় নতুন পণ্যের সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায় এবং গ্রাহকের বিপুলসংখ্যক অর্ডারের বিপরীতে পণ্য সরবরাহ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। এভাবে বিশাল মূল্য ছাড়ের উপর নির্ভর করে গড়ে ওঠা ব্যবসায়িক মডেলটি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে এবং পুরো ই-কমার্স খাতটিকেই ঝুঁকির মুখে ফেলে দেয়। ই-কমার্স নিয়ে সবার মাঝেই তৈরি হয় আস্থার সংকট, যাকে এই সম্ভাবনাময় খাতের বিকাশের অন্যতম প্রতিবন্ধকতা হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে।

গ্রাহকের নিকট থেকে মূল্য বাবদ অগ্রিম প্রাপ্ত টাকার উপর নির্ভর করে পরিচালিত ব্যবসায়ের জন্য চলতি দায় ও চলতি সম্পত্তির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা অতীব গুরুত্বপূর্ণ। একে ব্যবসায়ের পরিভাষায় চলতি মূলধন ব্যবস্থাপনা বলা হয়। অগ্রিম প্রাপ্ত টাকা ব্যবসায়ের চলতি দায়। এ দায় মেটানোর জন্য পর্যাপ্ত চলতি সম্পদ যেমন মজুদ পণ্য থাকা প্রয়োজন।

কোনো প্রতিষ্ঠানের চলতি দায় যদি দীর্ঘসময় ধরে চলতি সম্পত্তির বেশি হয় সেই প্রতিষ্ঠানের দায় পরিশোধের সক্ষমতা ক্রমান্বয়ে হ্রাস পায় এবং ভবিষ্যতে দেউলিয়া হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। আমাদের দেশের ই-কমার্স ব্যবসায় এমনটিই ঘটেছে।

প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রাহকের কাছ থেকে অগ্রিম টাকা নিয়েছে কিন্তু সরবরাহ করার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ পণ্য সংগ্রহ বা সংরক্ষণ করেনি। মূল্য ছাড়ের বিজ্ঞাপনে ‘স্টক থাকা সাপেক্ষে’ শর্ত যুক্ত করে দিলেও বাস্তবে স্টক না থাকার পরেও গ্রাহকের অর্ডার গ্রহণ করেছে ও অগ্রিম টাকা নিয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান ক্রেতার সংখ্যা বাড়াতে মনোযোগী হলেও ক্রেতার সন্তুষ্টি অর্জন করে তাকে ধরে রাখার কোনো চেষ্টা করেনি। পুরো বিষয়টিকেই দেখা যেতে পারে ব্যবস্থাপনার ত্রুটি বা ব্যর্থতা হিসেবে। এই ব্যর্থতা উদ্যোক্তা বা ব্যবস্থাপকদের ইচ্ছাকৃত না অনিচ্ছাকৃত সেটি বিশ্লেষণের দাবি রাখে।

ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত ত্রুটি-বিচ্যুতি দূর করতে আর্থিক ব্যবস্থাপনার মৌলিক নীতিগুলো সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে হবে ও প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। পরিবার ভিত্তিক বড় বড় প্রতিষ্ঠানে সুশাসন নিশ্চিত করতে দরকার কার্যকর নীতিমালা ও তার প্রয়োগ। এক্ষেত্রে ই-কমার্স নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে ও ই-কমার্সের সাথে জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক অবস্থা ও ব্যবস্থাপনা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। অন্যথায় অপরিকল্পিত মূল্য ছাড়ের সংস্কৃতির উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা ব্যবসায়িক মডেলটি যে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে না তা ইভ্যালি, ই-অরেঞ্জের মতো ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যর্থতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। তাই এই মডেলের ভবিষ্যৎ প্রযোজ্যতা নিয়ে ই-কমার্সের উদ্যোক্তাদের নতুনভাবে চিন্তা করতে হবে।

কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের প্রতারণা ও জালিয়াতির কারণে ই-কমার্সের মতো একটি বিপুল সম্ভাবনাময় খাতের পরিপূর্ণ বিকাশের পথে যে অন্তরায় সৃষ্টি হয়েছে তা দূরীভূত করতে যত দ্রুত সম্ভব এই খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে। এজন্য এই খাতের উদ্যোক্তা থেকে শুরু করে ভোক্তা, সরবরাহকারী, ব্যবস্থাপক, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, আইন প্রণেতা ও প্রয়োগকারীসহ সকলের যৌথ প্রয়াস ও দায়িত্বশীল উদ্যোগ একান্তভাবে কাম্য।