শেখ রেহানা : এক দুঃখিনী রাজকন্যার গল্প

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১৩, ২০২১

গল্পটা বাংলাদেশের এক মধ্যবিত্ত পরিবারের ছোট মেয়ের। বাবা রাজনীতি করেন, বাসার চেয়ে কারাগারে বা আন্দোলনেই কাটে বেশিরভাগ সময়। বাবার চেয়েও বড় লড়াকু মা। বাবার লড়াই বাইরে, রাজনীতির মাঠে। আর মায়ের লড়াই ঘরে, পাঁচ ছেলেমেয়ে নিয়ে টিকে থাকার লড়াই। মুরগি যেভাবে বাচ্চাদের আগলে রাখে, মা সেভাবেই আগলে রাখেন গোটা পরিবারকে।

বাবা কারাগারে গেলে বাবার রাজনীতিও মাকেই দেখভাল করতে হয়। পরিবারের ছোট মেয়ের এসব লড়াই সংগ্রামে ভ্রুক্ষেপ নেই। মায়ের শাসনে, হঠাৎ হঠাৎ পাওয়া বাবার আদরে, বড় ভাই-বোনদের আহ্লাদে-প্রশ্রয়ে তার প্রজাপতির জীবন। পরিবারের রাজকন্যা যেন। ছোট্ট একটা ভাই আছে, যেন তার খেলার পুতুল, দুষ্টুমির সঙ্গী।

দীর্ঘ লড়াই, সংগ্রাম, যুদ্ধ শেষে দেশটা স্বাধীন হলো। বাবা হলেন রাষ্ট্রপতি। সেই মেয়েটি যেন সত্যি সত্যি রাজকন্যা হলো। কিন্তু তাদের জীবন বদলালো না। বাবার রাষ্ট্রপতি হওয়া না হওয়ায় কোনো ফারাক নেই। আগের বাসায়ই থাকেন। মায়ের বকুনি, বাবার আদর, বোনের স্নেহ সব আগের মতোই।

বড় বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। দুলাভাই বিজ্ঞানী, তার কাছেও সেই রাজকন্যার আবদারের কমতি নেই। দুলাভাইয়ের চাকরি পশ্চিম জার্মানিতে, বোনও যাবেন সাথে। রাজকন্যার বয়স তখন কুড়ি। সারাক্ষণ উড়ু উড়ু মন। যা দেখেন, তাই ভালো লাগে। নতুন সবকিছু দেখতে ইচ্ছা করে। তার আবদার তিনিও বোনের সাথে জার্মানি যাবেন। গেলেনও। সেই যে গেলেন, তাতেই বদলে গেল রাজকন্যার জীবন।

জার্মানি গেলেন বলে দুই বোনই শুধু বেঁচে গেলেন। এক অন্ধকার ভোর কেড়ে নিল তাদের জীবনের সব আলো। রাতারাতি রাজকন্যা থেকে তারা উদ্বাস্তু বনে গেলেন।

শেখ রেহানা কিছুতেই নেই; না সংগঠনে, না ক্ষমতায়। অদ্ভুত এক নির্মোহ জীবন তার। বড় বোনকে আগলে রাখা ছাড়া তার আর কিছুই চাওয়ার নেই। এই বোনই তার মা, এই বোনই তার বাবা, এই বোনই তার অভিভাবক।
এ এক দুঃখিনী রাজকন্যার গল্প। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছোট মেয়ে শেখ রেহানার গল্প। মাত্র ২০ বছর বয়সে বাবা, মা, ভাই, ভাবী, আত্মীয় সবাইকে হারিয়ে অসহায় বনে গেলেন।

কখনো কি ভেবেছেন, বড় বোন শেখ হাসিনার সাথে জার্মানি না গেলেই ভালো হতো। তাহলে তাকে এই অসীম বেদনা ভার বয়ে বেরাতে হতো না আজীবন। কিন্তু বাঙালি জাতির সৌভাগ্য ঘাতকদের বন্দুকের নল বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যার নাগাল পায়নি। ভাবুন একবার, আদুরে রাজকন্যা, প্রজাপতির মতো উড়ু উড়ু জীবন থেকে প্রবল অনিশ্চিত এক জীবনে লাফ।

জার্মানি থেকে ঠাঁই হলো নয়াদিল্লিতে। সেখান থেকে গেলেন যুক্তরাজ্যে। থিতু হলেন সেখানেই। ১৯৭৭ সালে বিয়ে করলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. শফিক আহমেদ সিদ্দিককে।

আদুরে রাজকন্যা ততদিনে মায়ের মতো লড়াকু এক নারী। তিন সন্তানকেই সুশিক্ষায় শিক্ষিত করেছেন, মানুষের মতো মানুষ করেছেন। বড় মেয়ে টিউলিপ রেজওয়ানা সিদ্দিক ব্রিটিশ পার্লামেন্টে লেবার পার্টির এমপি। একমাত্র ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক একটি আন্তর্জাতিক সংস্থায় কর্মরত এবং আওয়ামী লীগের গবেষণা উইং সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশনের (সিআরআই) ট্রাস্টি। আর সবার ছোট মেয়ে আজমিনা সিদ্দিক রূপন্তী লন্ডনে ‘কন্ট্রোল রিস্কস’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের গ্লোবাল রিস্ক অ্যানালাইসিস এডিটর।

১৯৮১ সালে বড় বোন শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আওয়ামী লীগের হাল ধরেন। তারপর দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রাম শেষে ২১ বছর পর শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় আসে। ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল করে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার শুরু হয়। কিন্তু বিচার শেষ হওয়ার আগেই ক্ষমতার পালাবদল ঘটে।

সরাসরি রাজনীতি না করলেও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রশ্নে, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রশ্নে, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলার গড়ার প্রশ্নে শেখ রেহানা অবিচল; বাংলাদেশের বাতিঘর।

আবার লড়াই-সংগ্রাম শেষে ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। শেষ হয় বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার। শেষ হয়, দুই বোনের দীর্ঘ অপেক্ষা। এই বিচারে জাতি গ্লানিমুক্ত হয়েছে। কিন্তু দুই বোনের অপরিসীম বেদনাভারের কি একটুও উপশম হয়েছে?

যারা ‘হাসিনা : অ্যা ডটার’স টেল’ দেখেছেন, তারা জানেন, শেখ রেহানা কেমন আবেগী, ইমোশনাল। তিনি বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু প্রতিশোধে বেদনার উপশম হয় না। বড় বোন শেখ হাসিনা তাকে সান্ত্বনা দিয়েছেন, আগলে রেখেছেন। কতদিন এক বোন আরেক বোনকে জড়িয়ে ধরে ভেসে গেছেন কান্নার সাগরে।

শেখ হাসিনা ৪০ বছর ধরে আওয়ামী লীগের হাল ধরে আছেন, গত এক যুগ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বাংলাদেশকে নিয়ে গেছেন অন্য উচ্চতায়। কিন্তু শেখ রেহানা কিছুতেই নেই; না সংগঠনে, না ক্ষমতায়। অদ্ভুত এক নির্মোহ জীবন তার। বড় বোনকে আগলে রাখা ছাড়া তার আর কিছুই চাওয়ার নেই। এই বোনই তার মা, এই বোনই তার বাবা, এই বোনই তার অভিভাবক। শেখ হাসিনা এখনো যেভাবে আদরে-মমতায় জড়িয়ে রাখেন শেখ রেহানাকে; মনে হয় তার বয়স এখনো সেই ২০।

ক্ষমতার কেন্দ্রে থেকেও ক্ষমতা থেকে দূরে শেখ রেহানা। ছায়া হয়ে আছেন শেখ হাসিনার পাশে। শেখ হাসিনা যখন মাঠের লড়াইয়ে ব্যস্ত, তখন বোনের সংসার-সন্তানদের দেখে রাখেন শেখ রেহানা।

১/১১ এর সময় শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তারের পর গভীর সংকটে পরে আওয়ামী লীগ তথা বাংলাদেশের রাজনীতি। আওয়ামী লীগকে ভাঙার চেষ্টা হয়, শেখ হাসিনাকে মাইনাস করার ষড়যন্ত্র হয়। তখন পর্দার আড়ালে থেকে দৃঢ় অবস্থান নিয়ে সেই সংকট থেকে জাতিকে উদ্ধারে বড় ভূমিকা রাখেন শেখ রেহানা।

সরাসরি রাজনীতি না করলেও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রশ্নে, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রশ্নে, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলার গড়ার প্রশ্নে শেখ রেহানা অবিচল; বাংলাদেশের বাতিঘর।

আজ এই দুঃখিনী রাজকন্যার জন্মদিন। বাংলাদেশের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা ধারণ করে আরও অনেক দীর্ঘ হোক এই রাজকন্যার জীবন। বাংলাদেশের স্বার্থেই শেখ হাসিনাকে সাহস দিন, শক্তি দিন; ছায়া হয়ে পাশেই থাকুন। আপনাদের দুই বোনই বঙ্গবন্ধুর ছায়া, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ।