পিরোজপুরের কুড়িয়ানা বাজারে পেয়ারার মণ ২০০ টাকা

প্রকাশিত: জুলাই ২৫, ২০২১

পেয়ারাভর্তি নৌকা ভাসতে ভাসতে চলে আসে বাজারে। আবার ভাসমান অবস্থাতেই চলে বিক্রি। কেউ বিক্রি করেন আবার কেউ কিনতে নৌকা নিয়ে আসেন। কেনা শেষে ফিরে যান অন্য হাটে। শুধু পেয়ারা নয়, লেবু, শাকসবজিসহ বিভিন্ন বিক্রয়যোগ্য পণ্য আসে পিরোজপুরের কুড়িয়ানা হাটে। ফলে বছরজুড়েই এই হাট থাকে ক্রেতা-বিক্রেতায় পরিপূর্ণ।

তবে পেয়ারার মৌসুমে বাজারগুলো ক্রেতা-বিক্রেতা ও পর্যটকদের পদচারণে মুখর থাকে। এসব এলাকার মূল হাটবাজারগুলো ভাসমান হওয়ায় নৌকাতেই চলে সব বেচাকেনা। মৌসুমি সময়ে কেনাবেচা বেশি হলেও এই ভাসমান হাটটির চাহিদা থাকে বছরজুড়ে। এই হাট থেকে পেয়ারাসহ অন্য পণ্য কিনে নিয়ে পাইকাররা তা বিক্রি করেন দেশের বিভিন্ন স্থানে।

পিরোজপুর জেলার নেছারাবাদ উপজেলা সদর থেকে আটঘর কুড়িয়ানা ইউনিয়নটি পাঁচ কিলোমিটার পূর্ব দিকে। উপজেলার জলাবাড়ি ও সমুদয়কাঠি ইউনিয়নের মোট ২২টি গ্রামের ৬৫৭ হেক্টর জমিতে রয়েছে ২ হাজার ২৫টি পেয়ারার বাগান। ৫০০ হেক্টর জমিতে পেয়ারা চাষ হয় শুধুই কুড়িয়ানা গ্রামেই, যা এলাকার মানুষের আয়ের প্রধান উৎস্য। চাষিরা ছোট ছোট ডিঙিনৌকায় পেয়ারাসহ অন্য পণ্য বোঝাই করে হাটে আসছেন।
তবে পেয়ারার ফলন ভালো হলেও পাইকারি ও খুচরা ক্রেতার অভাবে হুমকির মুখে পড়েছেন জেলার পেয়ারাচাষিরা। ক্রেতার অভাবে গাছ থেকে পেয়ারাও তুলতে পারছেন না চাষিরা। তবে তাদের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।

জানা যায়, দুই শতাধিক বছর আগে এ অঞ্চলের কেউ একজন তীর্থ করতে গিয়েছিলেন ভারতের বিহার রাজ্যের গয়ায়। সেখানে এই ফলের চাষ দেখে বীজ এনে বপন করেছিলেন নেছারাবাদ উপজেলার আটঘর-কুড়িয়ানায়। গয়া থেকে বীজ আনার পর গাছ ও গাছ থেকে ফল পাওয়ার পর এর নাম রাখা হয়েছিল গয়া। অপভ্রশং হতে হতে স্থানীয়রা এখন এই ফলকে ডাকে ‘গইয়া’ নামে।

আরও জানা যায়, শত বছর আগ থেকেই আটঘর, কুড়িয়ানা, জিন্দাকাঠি, ভীমরুলী, আদমকাঠি, ধলহার খালে পেয়ারার হাট বসে এবং এই এলাকাগুলোতেই বাণিজ্যিকভাবে চাষ হয় পেয়ারার। এ ছাড়া পার্শ্ববর্তী জেলা ঝালকাঠির সদর উপজেলা ও বরিশালের বানরীপাড়া উপজেলার ১২ থেকে ১৪টি গ্রামে পেয়ারার চাষ হওয়ায় ১৫ থেকে ২০টি ছোট-বড় ব্যবসাকেন্দ্র গড়ে উঠেছে। বর্তমানে হাটে প্রতি মণ পেয়ারা বিক্রি হচ্ছে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায়।

কথা হয় পেয়ারা ব্যবসায়ী সবুজ হালদারের সঙ্গে। তিনি বলেন, আমার প্রায় আড়াই একর জমিতে পেয়ারার বাগান আছে। আমি পড়াশোনা করি। পাশাপাশি পেয়ারার ব্যবসা করছি। করোনার কারণে বাইরের ব্যাপারীরা আসেন না। পেয়ারার দামও একটু কম। পেয়ারার মণ ১০০ থেকে ১৫০ টাকা। কিন্তু ব্যাপারীরা না এলে পেয়ারাচাষিদের জন্য বড় ক্ষতি হয়ে যাবে। প্রতি একরে বছরে খরচ হয় ৪০ হাজার টাকা। ভালো দাম পেলে বছরে ২ থেকে আড়াই লাখ টাকা লাভ হয়। আর লস হলে শ্রমিকদের খরচ জোগাতেই কষ্ট হয়ে যায়।

পেয়ারাচাষি অমিত হালদার বলেন, আমার এক বিঘা জামিতে পেয়ারার বাগান। প্রতিদিন ২ থেকে ৩ মণ পেয়ারা তোলা হয়। লকডাউনে ক্রেতা কম, তাই দামও কম। দেড় শ থেকে ২০০ টাকা মণ। ফলন ভালো হয়েছে। তবে ক্রেতা এলে আমরা একটু লাভবান হতাম। একজন শ্রমিকের দাম ৫০০ টাকা। পেয়ারার মণ যদি ২০০ টাকা হয়, তাহলে পেয়ারা গাছেই রেখে দিতে হবে।
পেয়ারার ক্রেতা ও বিক্রেতা শুভ্রজিৎ হালদার বলেন, আমি ক্রেতা ও বিক্রেতা। করোনার কারণে বর্তমানে আমরা খুব খারাপ অবস্থায় আছি। পাইকাররাও আসেন না। আমাদের পেয়ারা কিনতে ঢাকা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজারে থেকে পাইকাররা আসে। কিন্তু লকডাউনে তারা কী করে আসবে?

তিনি বলেন, সরকার লকডাউন দিয়েছে। কিন্তু আমাদের তো ফল বিক্রি করেই খেতে হয়। আমাদের মতো গরিব শ্রেণির লোকরা তো না খেয়ে মরবে। যেখানে আয় প্রতিদিন অন্তত ৫০০ টাকা হওয়ার কথা, সেখানে ২০০ টাকাও হয় না।

স্থানীয় আড়তদার নির্মল হালদার বলেন, আমি পেয়ারার ব্যবসার সঙ্গে জড়িত দীর্ঘদিন। পেয়ারা কিনে বিভিন্ন জেলায় পাঠাই। বিভিন্ন স্থান থেকে পাইকাররা এসে পেয়ারা নিয়ে যান। পিরোজপুরের স্বরূপকাঠী, ঝালকাঠীর ভিমরুলী ও বরিশালের কিছু অংশের সবাইকে নিয়ে এখানে হাট বসে। বিভিন্ন ধরনের শাকসবজিও ক্রয়-বিক্রয় করা হয়। বিশেষ করে এখানে পেয়ারার প্রধান্য বেশি।

নেছারাবাদ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা চপল কৃষ্ণ নাথ জানান, আমরা সব সময়ই পেয়ারাচাষির পাশে থাকি। প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে থাকি। তাদের বিভিন্ন সময় প্রকল্প থেকে প্রশিক্ষণ দিই। সরকার ৪ শতাংশ সুদে ঋণের ব্যবস্থা করেছে। যদি কারও আর্থিক সহায়তার প্রয়োজন হয়, তবে তারা এই ঋণ গ্রহণ করতে পারবেন। কুড়িয়ানার ৮ থেকে ১০ জন কৃষককে কয়েক দিন আগে প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন এনজিওর মাধ্যমে তারা বিভিন্ন সময় নানা প্রশিক্ষণ পেয়ে থাকেন।

তিনি বলেন, উপজেলায় মোট ২২টি গ্রামের ৬৫৭ হেক্টর জমিতে ২ হাজার ২৫টি পেয়ারার বাগান আছে। ৫০০ হেক্টর জমিতে পেয়ারা চাষ হয় শুধুই কুড়িয়ানা গ্রামেই। যা এলাকার মানুষের আয়ের প্রধান উৎস্য।

নেছারাবাদ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মোশারেফ হোসেন জানান, আমরা বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসক স্যারকে নিয়ে ওখানকার পর্যটন শিল্প ও পেয়ারার হাট পরিদর্শন করেছি। পেয়ারা ভালো বিক্রি হওয়ায় চাষিরা ভালো দাম পাচ্ছেন বলে জেনেছি। এখানের একটা সমস্যা হলো যে পেয়ারাগুলো যখন একসঙ্গে পেকে যায়, তখন এগুলো একসঙ্গে বিক্রি করতে পারে না তারা।

তিনি বলেন, যেহেতু প্রাকৃতিকভাবেই এই পেয়ারাগুলো আলাদা সময়ে পাকে না। এক সপ্তাহের মধ্যে সব একবারে পেকে যায়, সে ক্ষেত্রে চাষিদের একটু বেশিই হিমশিম খেতে হয়। লকডাউনের কারণে তাদের ব্যবসায় ঘাটতি বলে আমাদের জানিয়েছেন। যদিও এই পণ্য বা মালামাল পরিবহনে সরকারের কোনো বিধিনিষেধ নাই। সেটি আমরা তাদের জানিয়েছি। এ ছাড়া আমরা তাদের সব ধরনের সহযোগিতা করব বলে তাদের নিশ্চিত করেছি।