পোশাকশিল্পের বাইরের কারখানায় মৃত্যু বাড়ছে

প্রকাশিত: জুলাই ১৩, ২০২১

বিলসের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৫ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত সময়ে দেশে সব ধরনের কারখানায় মোট ১৪টি বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড ঘটে। এতে মোট মৃত্যু হয় ১ হাজার ৫৫৩ জনের। এ ছাড়া শুধু রানা প্লাজা ধসে ১ হাজার ১৩৬ জন পোশাকশ্রমিক মারা যান। এর বাইরে বাকি ১৩টি কারখানায় ৪১৭ জন শ্রমিক অগ্নিকাণ্ডের শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।

ওই সময়ে ঘটা অগ্নিকাণ্ডের মধ্যে মাত্র দুটি ছিল প্যাকেজিং কারখানায়। ২০১৫ সালে মিরপুরের স্টাইরোফোম প্যাকেজ ফ্যাক্টরিতে ১৩ জন, ২০১৬ সালে গাজীপুরের টঙ্গীতে ট্যাম্পাকো ফয়েলস ফ্যাক্টরিতে ৩৪ জন মারা যান। অগ্নিকাণ্ডের শিকার হওয়া ওই দুই কারখানায় তৈরি পোশাক খাতসহ অন্যান্য শিল্পপণ্যের জন্য প্রয়োজনীয় মোড়ক এবং প্যাকেট তৈরি হতো। তৈরি পোশাক কারখানার মতো সেখানেও বিভিন্ন তলায় অনেক শ্রমিক একসঙ্গে কাজ করতেন।

অন্যদিকে ২০১৮ থেকে ২০২১ সালের ৭ জুলাই পর্যন্ত শিল্পকারখানার অগ্নিকাণ্ডে ১৬৮ জন শ্রমিক মারা গেছেন। এর মধ্যে ১ জন হচ্ছেন তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিক। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় এই সময়ে এ খাতের ৪০ জন শ্রমিক আহত হন। আর অন্যান্য খাতের শ্রমিকের মৃত্যু সংখ্যা ১৬৭ জন। আহত হয়েছেন প্রায় ৩০০ শ্রমিক। অর্থাৎ এই সময়ের প্রতি ছয় মাসে ২৪ জন করে শ্রমিক মারা গেছেন।

পোশাকশিল্পের বাইরের কারখানায় মৃত্যু বেশি কেন, জানতে চাইলে বেসরকারি সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের এখানে অর্থনীতি ও শিল্প খাতের উন্নয়নের গতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এসব খাতের তদারককারী সরকারি সংস্থাগুলোর সক্ষমতা বাড়ছে না। রানা প্লাজার দুর্ঘটনার পর তৈরি পোশাক খাতের সুরক্ষাব্যবস্থার উন্নতি হয়েছে। তবে এর বড় কারণ ছিল পণ্য ক্রয় ও কার্যাদেশ প্রদানকারী কোম্পানিগুলো এ জন্য চাপ সৃষ্টি করা। সরকারও এ ব্যাপারে বেশ সোচ্চার ছিল। কিন্তু দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারের জন্য পণ্য উৎপাদনকারী অন্য শিল্পকারখানাগুলোর সুরক্ষাব্যবস্থার তেমন উন্নতি হয়নি। রূপগঞ্জের হাসেম ফুডে আগুন এর বড় প্রমাণ। এ ধরনের ঘটনা দেশের শ্রম নিরাপত্তাকে হুমকিতে ফেলার পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগকেও নিরুৎসাহিত করবে।

কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের সাফাই

বিলস সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর গাজীপুরের কালিয়াকৈরে এফবি ফুটওয়্যারে আগুনে পুড়ে ১ জন শ্রমিক মারা যান এবং ২০ জন আহত হন। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে রওজা হাইটেক লাক্সারি ফ্যান কারখানায় ১০ জন এবং একই বছর নভেম্বরে প্রাইম প্লেট অ্যান্ড প্লাস্টিক ইন্ডাস্ট্রিতে ২২ জন নিহত ও ১২ জন আহত হন।

এসব কারখানায় নিয়মিত পরিদর্শন ও তদারকির দায়িত্ব সরকারের কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের। তাদের প্রায় ৪০০ কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছে। নতুন কারখানার লাইসেন্স দেওয়া এবং নবায়ন করাও তাদের কাজ।

পরিদর্শন ও তদারকির ঘাটতি বিষয়ে জানতে চাইলে একাধিক কর্মকর্তা জনবল কম থাকার বিষয়টি তুলে ধরেন। বেশির ভাগ শিল্পকারখানায় যে দেশীয় আইন ও আন্তর্জাতিক নিয়ম মানা নিশ্চিত করা যায় না বলেও স্বীকার করেন তাঁরা।

জানতে চাইলে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের শ্রম অনুবিভাগের দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত সচিব মো. রেজাউল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘তৈরি পোশাক খাতের কারখানাগুলোর বাইরে অন্য কারখানাগুলোকে নিয়মের আওতায় আনতে আমরা বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছি। কারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তরকে আরও শক্তিশালী করতে আমরা জনবল ও ক্ষমতা বাড়াচ্ছি। আশা করছি, দ্রুততম সময়ের মধ্যে সেখানেও দুর্ঘটনা কমে আসবে।’

বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক ওয়াজেদুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, তৈরি পোশাক খাতে কিছুটা হলেও শ্রমিকদের সংগঠন করার অধিকার আছে। কিন্তু খাদ্য, প্লাস্টিকসহ অন্য খাতগুলোতে শ্রমিকদের ন্যূনতম অধিকারও নেই। রূপগঞ্জের হাসেম ফুডসের কারখানায় আগুন লেগে মারা যাওয়া শ্রমিকেরা আসলে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকার থেকে তাদের যে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে, তা সঠিক হয়নি। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) আইন অনুযায়ী, এই শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ কর্মক্ষম জীবনের সম্ভাব্য বেতনের সমপরিমাণ অর্থ ক্ষতিপূরণ হিসেবে তাঁদের পরিবারকে দিতে হবে।

পোশাক কারখানায় উন্নতি

২০১৩ সালে রানা প্লাজা ধসে বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের প্রাণহানির পর তৈরি পোশাক খাতের প্রতি সংশ্লিষ্ট সবার মনোযোগ আসে। মূলত রপ্তানি আদেশ প্রদানকারী বিদেশি ক্রেতা সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক শ্রম অধিকার সংস্থাগুলো বেশি উদ্যোগী হয়। শ্রম পরিবেশ এবং সুরক্ষা নিশ্চিতবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্স এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা আইএলও মাঠে নামে।

ওই আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়সহ (বুয়েট) বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংস্থা থেকে তৈরি পোশাক কারখানাগুলোকে নিরাপদ করতে কারিগরি সহায়তা দেওয়া শুরু হয়। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা তৈরি পোশাক কারখানাগুলোর ভবনগুলোকে ভূমিকম্পসহ নানা ধরনের দুর্ঘটনা–সহনশীলভাবে পুনর্নির্মাণ করা হয়। অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা উন্নত করতে ভবনগুলোর ভেতরে শ্রমিকদের কাজ করার জায়গা, পণ্য রাখার স্থান এবং অগ্নিনির্বাপণের জন্য আলাদা স্থান রাখার ব্যবস্থা করা হয়। বন্ধ করে দেওয়া হয় দুর্বল অনেক কারখানা। এর মধ্য দিয়ে পোশাক খাতের কারখানাগুলোতে নিরাপত্তাব্যবস্থার উন্নতি হয়।

বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও অ্যালায়েন্সের উপদেষ্টা অধ্যাপক মুজিবর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, তৈরি পোশাক কারখানাগুলোকে দুর্ঘটনা–প্রতিরোধী করতে বেশ কিছু কাঠামোগত এবং ব্যবস্থাপনাগত পরিবর্তন আনা হয়। কিন্তু খাদ্যপণ্যসহ অন্য শিল্পকারখানাগুলোর বড় অংশ এখনো গুদামের মতো পরিচালিত হচ্ছে। যেখানে দাহ্য পদার্থ রাখা, সেখানেই শ্রমিকদের কাজের জায়গা। বিদ্যুৎ-সংযোগও সেখানে। এ কারণে কোথাও আগুন লাগলে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। এসব কোম্পানির মালিকেরা শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়টিকে কোনোভাবেই গুরুত্ব দেন না। এ অবস্থার দ্রুত পরিবর্তন না আনলে সামনে আর বড় দুর্ঘটনা হয়তো অপেক্ষা করছে।

তবে রোববার ঢাকায় সিপিডির এক সংলাপে উল্লেখ করা হয়েছে, এখনো প্রায় ২২ শতাংশ পোশাক কারখানা পরিদর্শন ও তদারকির বাইরে রয়েছে।