বিশ্বকাপের সময় বাংলাদেশকেও ব্রাজিল মনে হয়েছিল রাষ্ট্রদূতের

প্রকাশিত: জুলাই ৫, ২০২১

বিশ্বকাপ সময়ের মতোই অনেকটা উন্মাদনায় মেতেছেন বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীরা। রাতে ইউরো, ভোরে কোপা আমেরিকা উপভোগ করছেন তারা। ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে চলছে তুমুল আলোচনার ঝড়। বাংলাদেশে নিযুক্ত ব্রাজিলের রাষ্ট্রদূত জোয়াও তাবাজারা দে আলিভেইরা জুনিয়র ঢাকায় থেকে নিজের দেশে চলমান কোপা আমেরিকার ম্যাচ দেখছেন। ঢাকা পোস্টের সিনিয়র স্পোর্টস রিপোর্টার আরাফাত জোবায়ের এর সঙ্গে কথা বলেছেন ব্রাজিল ও বাংলাদেশের ফুটবলের নানা প্রসঙ্গে।

প্রশ্ন: এবার কোপা ব্রাজিলে হচ্ছে। কেমন উপভোগ করছেন?

রাষ্ট্রদূত: বেশ ভালোই লাগছে। ব্রাজিল স্বাগতিক এবং ভালোই খেলছে। তিতে দলকে দারুণভাবে পরিচালনা করছে। শুধু কোপা নয়, সামনের বিশ্বকাপকে সামনে রেখেই সে এগিয়ে যাচ্ছে। এটা খেলার পরিকল্পনা ও খেলোয়াড়দের সুযোগ দেওয়া দেখেই বোঝা যাচ্ছে। সে রিজার্ভ বেঞ্চের খেলোয়াড়দের যেমন সুযোগ দিচ্ছে আবার নেইমারের মতো গুরুত্বপূর্ণ ফুটবলারকেও বিশ্রাম দিচ্ছে। তিনি জানেন দক্ষিণ আমেরিকায় একটু রাফ খেলা হয়। এক ম্যাচে তো মেসি মারাত্মক ইনজুরিতে পড়তে পারতো। ব্রাজিলের খেলায় আমি খুশি।

প্রশ্ন: ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার দুই তারকা নেইমার ও মেসির পারফরম্যান্স আপনার দৃষ্টিতে এবারের কোপায় কেমন?

রাষ্ট্রদূত: দুই জনই দারুণ খেলছে। দুই জনই দলের জয়ের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে তারা।

প্রশ্ন: ব্রাজিল-আর্জেন্টিনাকে ফাইনাল দেখছে অনেকে। আপনি কি মনে করেন?

রাষ্ট্রদূত : যুক্তি বলে হ্যাঁ। তবে ব্রাজিলে একজন রয়েছেন যিনি ১৯৭০ থেকে ব্রাজিলের খেলায় ধারাভাষ্যে ও সম্প্রচারে যুক্ত। তাকে কখনো ব্রাজিলের ম্যাচের প্রেডিকশন বা ফলাফল সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলতেন, ‘ফুটবল ইজ এ ফুল অফ বক্স, এনিথিং কেন হ্যাপেন।’ আমি মনে করি, ব্রাজিল ফাইনালে যাওয়ার সব সামর্থ্যই রয়েছে। ব্রাজিল অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ দল।

পেরুরও চমক দেওয়ার ক্ষমতা আছে। তাদের কয়েকজন বিপদজনক খেলোয়াড় আছে। ফুটবলে ভাগ্যের ব্যাপার আছে। যদিও এটা অনেকে স্বীকার করে না। ফাইনাল যাওয়ার ক্ষেত্রে আর্জেন্টিনার সম্ভাবনা বেশি দেখছি আমি।

প্রশ্ন: এখন তো কোপার পাশাপাশি ইউরোও চলছে। অনেকে বলছে আকর্ষণ ও জনপ্রিয়তায় ইউরো কোপাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। আপনার দৃষ্টিভঙ্গি কী?

রাষ্ট্রদূত: ইউরোপে ফুটবলে প্রচুর বিনিয়োগ ও বাণিজ্য। ফুটবল এখন শুধু খেলাই নয় বড় পণ্য ও বাণিজ্য শিল্পও। সেই বাজারে ইউরোপ অবশ্যই এগিয়ে। আরেকটি বিষয়টি খেয়াল করবেন, ইউরোপের বাজারে কিন্তু ব্রাজিলিয়ান ফুটবলারদের দরই তুলনামূলক বেশি থাকছে। আগে রোনালদো দামি ফুটবলার ছিল, এরপর রোনালদিনহো, কাকা, নেইমার। মার্সেলোর ছেলেও দুর্দান্ত ফুটবলার সামনে সেও অনেক বড় হবে।

প্রশ্ন: বাংলাদেশে ব্রাজিলের সমর্থক অনেক। বিষয়টি কেমন লাগে আপনার?

রাষ্ট্রদূত: অসম্ভব ভালো লাগে। আমি ২০১৭ সালে বাংলাদেশে দায়িত্ব নিয়ে আসি। পরের বছরই বিশ্বকাপ। এর আগে একদিন ঘুমিয়ে ছিলাম। মনে হয়েছিল ব্রাজিলেই ঘুমাচ্ছি। ঘুম থেকে উঠে সকালে পতাকা মানুষের গায়ে জার্সি দেখে মনে হল যেন আমি ব্রাজিলে। বিশ্বকাপের সময়টা আমি নারায়াণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জসহ অনেক জায়গায় গিয়েছি। আমার কখনো মনে হয়নি, আমি ব্রাজিলের বাইরে আছি। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ব্রাজিলের বাইরে বাংলাদেশেই সবচেয়ে বেশি সংখ্যক সমর্থক তাদের। আমরা সত্যি বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের কাছে অত্যন্ত কৃতজ্ঞ ব্রাজিলের প্রতি সমর্থনে।

প্রশ্ন: ২০১৮ বিশ্বকাপের সময় আপনি বলেছিলেন, জিকোকে বাংলাদেশে আনার চেষ্টা করবে ব্রাজিল দূতাবাস। জিকোকে আনার কোনো অগ্রগতি রয়েছে কি না?

রাষ্ট্রদূত: জিকোর সঙ্গে আমাদের আলোচনা প্রায় চূড়ান্তও হয়েছিল। ফুটবল ফেডারেশনকেও জানিয়েছিলাম। বাংলাদেশে আসার সম্ভাব্য সফরসূচিও ঠিক ছিল। হঠাৎ এর মধ্যে জরুরি এক কাজে সে জাপানে যান এর জন্য আর আসা হয়নি। বাংলাদেশের ব্রাজিল সমর্থকদের হতাশ হওয়ার কারণ নেই। করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আমরা আবার আলোচনা শুরু করব।

প্রশ্ন : তিন বছরের বেশি সময় বাংলাদেশে রয়েছেন। বাংলাদেশের ফুটবল দেখে কেমন লাগছে ?

রাষ্ট্রদূত : আমি বাংলাদেশের কয়েকটি ম্যাচ টিভিতে দেখেছি। তৃণমূল পর্যায়ের কিছু টুর্নামেন্ট দেখেছি। বিশেষ করে দুই বছর আগে ক্ষুদে বালিকাদের একটি টুর্নামেন্ট হয়েছিল। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে বসে আমি ফাইনালটি দেখেছিলাম। মেয়েরা অসম্ভব ভালো খেলে। আমি তিন বছর বয়স থেকে ফুটবল খেলেছি, ফুটবলটা আমি বুঝি। বাংলাদেশের নারী ফুটবলারদের মধ্যে আমি অসম্ভব মেধা দেখেছি। তারা ফুটবলটা হৃদয় ও মস্তিষ্ক দুইটা দিয়েই খেলে।

প্রশ্ন : দুই বছর আগে ব্রাজিল দূতাবাস, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং বাফুফের মাধ্যমে অনূর্ধ্ব ১৫ ও অনূর্ধ্ব ১৭’র দুই জন করে ফুটবলার ব্রাজিলে মাস খানেক অনুশীলন করেছিল। এই রকম উদ্যোগ কি ব্রাজিল দূতাবাস থেকে সামনে থাকবে?

রাষ্ট্রদূত: বাংলাদেশে নারী ফুটবলারদের পাশাপাশি তরুণরাও মেধাবী। আমাকে ব্রাজিলিয়ান ওই ক্লাব দলের কোচ বলেছে রক্ষণ বিভাগে খেলা ফুটবলারটি খুবই মেধাবী। সে ব্রাজিল দলেও খেলার মতো। ফুটবল ফেডারেশনের উচিত এদের সঠিকমতো পরিচর্যা করা। পাশাপাশি প্রচুর বিনিয়োগ দরকার ফুটবলে। বিনিয়োগ ছাড়া বর্তমান বিশ্বে ফুটবল উন্নয়ন সম্ভব না। সরকারি ও বেসরকারি উভয় পর্যায়ে ফুটবলে আরো অনেক বিনিয়োগ প্রয়োজন। আমরা ব্রাজিল দূতাবাস যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ক্রীড়াক্ষেত্রে কিছু বিষয় নিয়ে কাজ করছি। যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীও খুবই আন্তরিক এই ব্যাপারে। আশা করছি লকডাউন ও করোনা পরবর্তী সময়ে আমরা দুই পক্ষ সুন্দর কিছুই উপহার দিতে পারব।

প্রশ্ন: আপনি ছোটবেলায় ফুটবল খেলেছেন কি না এবং ব্রাজিলের তারকা ফুটবলারদের সঙ্গে কখনো দেখা-সাক্ষাৎ হয়েছে কী?

রাষ্ট্রদূত: আমি খুব ছোটবেলা থেকেই ফুটবলের সাথে সম্পৃক্ত। স্কুল পর্যায়ে খেলেছি। ব্রাজিলে থাকতে অনেক ফুটবলারের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ হয়েছে। বড় কোনো তারকা ফুটবলারের সঙ্গে সেভাবে ঘনিষ্ঠতা হয়নি। কূটনৈতিক হওয়ার পর ফ্রান্সে যখন ছিলাম কয়েকজন তারকা খেলোয়াড়ের সঙ্গে দেখা হয়েছে। লিওনার্দোর সঙ্গে বেশ কয়েকবার দেখা ও কথা হয়েছে।

প্রশ্ন: বাংলাদেশে আর্জেন্টিনার দূতাবাস নেই, ব্রাজিলের রয়েছে। এ দিক থেকে বাংলাদেশে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনার চেয়ে এগিয়ে গেল।

রাষ্টদূত: বাংলাদেশ মানবাধিকার, জাতীয় প্রবৃদ্ধিসহ নানা সূচকে অনেক উন্নতি করছে। কূটনৈতিকভাবেও বাংলাদেশ দারুণ অবস্থান তৈরি করেছে। ব্রাজিলের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কও সুন্দর ও সুসংহত। এজন্য ব্রাজিল বাংলাদেশে দূতাবাস স্থাপন করেছে। ল্যাতিন আমেরিকার আর কোনো দেশের দূতাবাস বাংলাদেশে নেই। সামগ্রিক আমেরিকা ধরলে কানাডা, আমেরিকার পর ব্রাজিলের দূতাবাস বাংলাদেশে।

প্রশ্ন: ফুটবল দিয়ে আলোচনা শেষ করি। ’৭০ এর পেলে নাকি ’৮২’র জিকো কোন দলকে এগিয়ে রাখবেন।

রাষ্ট্রদূত: দলের বিষয় বলার আগে পেলের বিষয় একটু বলতে চাই। পেলে অতুলনীয় একজন ফুটবলার। ফুটবলের সকল গুণের সর্বোচ্চ পর্যায়ে ছিলেন পেলে।

সেইভাবে দুই দলের মধ্যে তুলনা করাটা ঠিক হবে না। দুইটি দলই দারুণ ছিল। ৭০ এর পেলে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। ৮২’তে জিকোরা অনেক ভালো দল নিয়ে ব্যর্থ হলেও মানুষের হৃদয়ে এখনো তাদের নাম আছে।