এভাবে একটা বিশ্ববিদ্যালয় চলতে পারে না

প্রকাশিত: এপ্রিল ১৬, ২০২১

নানা অনিয়মে জর্জরিত এশিয়ান ইউনিভার্সিটি। নিয়মিত উপাচার্য, উপ-উপাচার্য ও ট্রেজারার না থাকায় শিক্ষার্থীদের সনদে স্বাক্ষর করার মতো বৈধ কোনো কর্মকর্তা নেই বিশ্ববিদ্যালয়টিতে। শুধু তাই নয়, প্রতিষ্ঠার প্রায় দুই যুগে দাঁড়িয়ে অনিয়মকেই যেন নিয়মে পরিণত করেছে বেসরকারি এ উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানটি।

বিশ্ববিদ্যালয়টির বিরুদ্ধে রয়েছে স্বেচ্ছাচারিতা, সনদ বাণিজ্য, একাডেমিক ও প্রশাসনিক দুর্নীতির পাহাড়সম অভিযোগ। তাই এ বিশ্ববিদ্যালয়কে আর চলতে দিতে চায় না বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। বিশ্ববিদ্যালয়টির সব ধরনের শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ করতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে চিঠি দিয়েছে সংস্থাটি।

৯ এপ্রিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিবের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনিয়মের সব ফিরিস্তি তুলে ধরে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০১০ এর ৩৫ (৭) ধারা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বলেছে ইউজিসি।

চিঠির সত্যতা নিশ্চিত করে ইউজিসির সদস্য (বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়) প্রফেসর ড. বিশ্বজিৎ চন্দ বলেন, ‘এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ করার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে চিঠি দিয়েছি। এত অনিয়মের মধ্যে একটি বিশ্ববিদ্যালয় চলতে পারে না।’

তিনি বলেন, ‘এ বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈধ কর্তৃপক্ষ বলতে রাষ্ট্রপতির নিয়োগপ্রাপ্ত উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, ট্রেজারার কেউ নেই। সবকিছুই অবৈধভাবে চলছে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে। এভাবে একটি বিশ্ববিদ্যালয় চলতে দেওয়া যায় না। মন্ত্রণালয়কে চিঠি পাঠিয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করেছি।’

ইউজিসি কর্মকর্তারা বলছেন, অনিয়মের শেষ নেই বেসরকারি ‘এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ’-এর বিরুদ্ধে। ২০১২ সালের পর থেকে চ্যান্সেলর (আচার্য) কর্তৃক নিযুক্ত উপাচার্য নেই এ বিশ্ববিদ্যালয়ে। আর প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে উপ-উপাচার্য-ট্রেজারারও নেই। অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়টিতে চ্যান্সেলরের পক্ষ নিযুক্ত বৈধ কোনো কর্তৃপক্ষ নেই। প্রতিষ্ঠার পর দুই যুগ অতিক্রান্ত হলেও নিয়ম ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের নীতিমালা অগ্রাহ্য করে একের পর এক অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার মধ্য দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। একাডেমিক ও প্রশাসনিক অনিয়মের মাধ্যমে এক অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে এ বিশ্ববিদ্যালয়, যা শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে দেওয়া চিঠিতে ইউজিসি বলেছে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০১০ অনুযায়ী উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক প্রধান। সিন্ডিকেট, একাডেমিক কাউন্সিল, শিক্ষক নিয়োগ কমিটি ও আইনে উল্লেখিত কর্মকর্তাদের নিয়োগ কমিটিসহ বিভিন্ন কমিটির সভাপতিও তিনি। কিন্তু এ বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘ সময় ধরে চ্যান্সেলর কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত বৈধ কোনো কর্তৃপক্ষের অনুপস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে অচলাবস্থা ও শূন্যতা তৈরি হয়েছে। সনদ জালিয়াতির অভিযোগও রয়েছে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের গত ১০ মার্চের একটি স্মারকে বলা হয়, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের বিরুদ্ধে প্রায়ই সনদ জালিয়াতির অভিযোগ পাওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়টিতে নিবিড় তদারকি ও মনিটরিং (পর্যবেক্ষণ) বাড়ানোর জন্যও ইউজিসিকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই তারিখের অন্য স্মারকে এশিয়ান ইউনিভার্সিটির সনদ জালিয়াতিতে সম্পৃক্ত থাকার বিষয়টি প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হওয়ায় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব ট্রাস্টির চেয়ারম্যানকে নির্দেশনা দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

ইউজিসি সূত্র জানিয়েছে, ১৯৯৬ সালে এশিয়ান বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রায় প্রতিনিয়ত এ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। ২০১২ সালের পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈধ কোনো কর্তৃপক্ষ নেই। সাবেক উপাচার্য ড. আবুল হাসান এম সাদেক ২০১২ সাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করছেন। শিক্ষার্থীদের মূল সনদসহ বিভিন্ন দাফতরিক ও একাডেমিক দলিলে স্বাক্ষর করছেন তিনি।

সূত্র বলছে, শিক্ষার্থীদের মূল সনদে যৌথভাবে স্বাক্ষর করেন ভিসি ও পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক। সাময়িক সনদে স্বাক্ষর করেন পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক। ইউজিসি বলছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদের যোগসাজশ ছাড়া শুধুমাত্র রেজিস্ট্রার ফারুক আহমেদের একার পক্ষে সনদ জালিয়াতি করা সম্ভব নয়। এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারাও অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত বলে মন্ত্রণালয়কে পাঠানো চিঠিতে জানিয়েছে ইউজিসি।

এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়টি শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের কোনো কারণ ছাড়াই ছাঁটাই, বহিষ্কার করে থাকে। ইউজিসির নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও চলতি স্প্রিং (বসন্ত) সেমিস্টারে ব্যাকডেটে অবাধে ছাত্র ভর্তি, সনদ বাণিজ্য, জঙ্গিবাদে আর্থিক মদদসহ, একাডেমিক ও প্রশাসনিক অনিয়ম করছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য ড. আবুল হাসান এম সাদেককে একাধিকবার ফোন ও মেসেজ দিয়েও উত্তর পাওয়া যায়নি।