মমতাকে নিয়ে কংগ্রেসের রাজ্য-কেন্দ্র মতানৈক্য

প্রকাশিত: মার্চ ১৩, ২০২১

পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায় আহত হওয়ার পর রাজ্য কংগ্রেস সভাপতি অধীর চৌধুরীর মন্তব্যকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কংগ্রেসের সঙ্গে দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় হাইকমান্ডের। অধীর চৌধুরীর রাজনৈতিক সৌজন্যবোধে অভাব রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে দলে।

গত ১০ মার্চ নন্দীগ্রামের রানিচকে একটি মন্দিরে ‘হরিনাম সংকীর্তনে’ অংশ নিয়ে বের হওয়ার সময় চার-পাঁচজন ব্যক্তির ধাক্কায় পড়ে গিয়ে গুরুতর আহত হন মমতা বন্দোপাধ্যায়। তারপর জরুরিভিত্তিতে তাৎক্ষণিকভাবে তাকে কলকাতায় নিয়ে এসএসকেএম হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

এই ঘটনার পর ওইদিনই এক প্রতিক্রিয়ায় অধীর চৌধুরী মন্তব্য করেন, নির্বাচনে জিততে রাজনৈতিক ভণ্ডামির আশ্রয় নিয়েছেন মমতা বন্দোপাধ্যায়। তিনি বলেন, ‘ক্ষমতাসীন দল থেকে গুজব রটানো হলো যে, মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে হামলা হয়েছে, ষড়যন্ত্র হয়েছে, তাকে মারার চেষ্টা হয়েছে। তিনি দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠুন, এটা সর্বশক্তিমানের কাছে প্রার্থনা করছি। কিন্তু এটাও বলছি, কেন এই ধরনের গুজব রটানো হচ্ছে? মানুষের আবেগকে কাজে লাগানোর জন্য মিথ্যা খবর করানোর চেষ্টা কেন?’

‘ষড়যন্ত্রের অজুহাত দিয়ে উনি মানুষের সহানুভূতি পেতে চাইছেন। এটা অজুহাত দিয়ে ভোটে জেতার চেষ্টা।’

তবে এ বিষয়ে কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্ব অধীরের মন্তব্যকে সমর্থন করেনি। দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে— এটা প্রদেশ সভাপতির ব্যক্তিগত মত। পাশাপাশি মমতা বন্দোপাধ্যায়ের দ্রুত আরোগ্যও কামনা করেছে কংগ্রেস হাইকমান্ড। অমরিন্দর সিং, অশোক গেহলটের মতো কংগ্রেসের জ্যেষ্ঠ নেতারা ইতোমধ্যে দোষীদের গ্রেফতারের দাবি তুলেছেন। কংগ্রেসের জ্যেষ্ঠ নেতা মনীশ তিওয়ারি নাম না নিয়ে অধীর চৌধুরীকে কটাক্ষ করে বলেছেন, ‘আজকালকার নেতারা রাজনৈতিক সৌজন্যে বিশ্বাস করে না।’

রাজ্য কংগ্রেসের সঙ্গে কেন্দ্রের এই মতানৈক্য অবশ্য নতুন ব্যাপার নয়। দলটির এক জ্যেষ্ঠ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডিডব্লিউকে বলেন, পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে বারবার কংগ্রেসে এই ধরনের ঘটনা ঘটেছে। সোনিয়া গান্ধী দিল্লিতে বৈঠক করলেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সেখানে চান। কংগ্রেস হাইকমান্ড সবসময়ই স্পষ্ট করে দিয়েছে, তাদের প্রধান শত্রু হলো বিজেপি। সে কারণে মমতার বিরুদ্ধে সর্বাত্মক বিরোধিতার রাস্তায় যেতে চায় না কংগ্রেস। কিন্তু রাজ্য নেতাদের মত, বিজেপি-র পাশাপাশি তৃণমূলের বিরোধিতা না করলে রাজ্যে দলকে বাঁচানো যাবে না।

পশ্চিমবঙ্গের প্রবীণ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক শুভাশিস মৈত্র মনে করেন, পশ্চিমবঙ্গ কংগ্রেসের প্রায় পুরোটাই তৃণমূলে চলে গেছে। নেতা গেছেন, ভোট গেছে। সামান্য কিছুটা এখন কংগ্রেস হিসাবে আছে।

ডয়চে ভেলেকে তিনি বলেন, ‘কোনো সন্দেহ নেই, অধীর ভালো নেতা। মুর্শিদাবাদে তিনি সব চেয়ে বড় শক্তি। কিন্তু তিনি এখনো পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে দলকে টেনে তোলার জায়গায় নেই। ফলে অধীর কী বলছেন তার খুব বেশি প্রভাব হবে না।’

‘কংগ্রেসের শক্তি রাজ্যে এতটাই কমেছে যে, কেন্দ্রীয় নেতাদের মমতা নিয়ে এক ধরনের কথা এবং অধীরের অন্য সুরের খুব বেশি গুরুত্ব নেই। কারণ এটা তো সত্য যে, অন্য অনেক রাজ্যের মতো পশ্চিমবঙ্গেও তারা অস্তিত্বরক্ষার লড়াই করছে।’

তবে প্রণব মুখোপাধ্যায়ের ছেলে অভিজিৎ মুখোপাধ্যায় মমতাকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে মনীশ বলেন, ‘এটাই হলো প্রকৃত রাজনৈতিক সৌজন্য। প্রণব মুখোপাধ্যায় থাকলে ছেলের জন্য গর্বিত হতেন।’

তবে কংগ্রেসে অধীরের ঘনিষ্ট নেতারা জানিয়েছেন, মনীশ নিজে লোকসভার নেতা হতে চেয়েছিলেন। না হতে পেরে এখন এই ধরনের কথা বলে গায়ের ঝাল মেটাচ্ছেন।

এখন দিল্লিতে সংসদের অধিবেশন চলছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে ভোট বলে অধীর সেই অধিবেশনে বেশি থাকতে পারবেন না। তাই এখন সাময়িকভাবে অধীরের দায়িত্ব পালন করবেন পাঞ্জাবের নেতা ও হুইপ রভনীত সিং বিট্টু।

এনিয়েও গুজব ছড়িয়েছিল যে, মমতাকে আক্রমণ করার জন্য অধীরকে লোকসভার নেতার পদ থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে; কিন্তু অধীরের দাবি, এই গুজবও তৃণমূল ছড়িয়েছিল। ভোট চলছে বলে তিনি এবং আসাম, কেরালা, তামিলনাড়ুর নেতারা অধিবেশনে থাকতে পারবেন না, তাই বিট্টুকে সাময়িকভাবে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।

সূত্র: ডিডব্লিউ