নিউইয়র্ক টাইমসে দারিদ্র্য নিরসনের রোল মডেল বাংলাদেশ

প্রকাশিত: মার্চ ১২, ২০২১

সর্ববৃহৎ অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্রেও রয়েছে দারিদ্র্য সংকট। বিশেষ করে শিশু-দারিদ্র্য। এই সংকট নির্মূলের চেষ্টা করছে দেশটি। সম্প্রতি মার্কিন কংগ্রেসে পাস হওয়া বিশাল প্রণোদনা প্যাকেজেও বিষয়টি রয়েছে। ঠিক এমন সময়ে দারিদ্র্য নিরসনে বাইডেন প্রশাসনকে পরামর্শ দিয়ে একটি কলাম প্রকাশ করেছে দেশটির প্রভাবশালী দৈনিক নিউইয়র্ক টাইমস। দৈনিকটির দীর্ঘদিনের পররাষ্ট্র প্রতিনিধি ও পুলিৎজারজয়ী সাংবাদিক নিকোলাস ক্রিস্টফের লেখা কলামে উদাহরণ দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশের। এর শিরোনাম, ‘হোয়াট ক্যান বাইডেন প্ল্যান ডু ফর পোভার্টি? লুক টু বাংলাদেশ’। পাঠকদের জন্য কলামটির অনূদিত অংশ তুলে ধরা হলো।

যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় নৈতিক ক্ষতগুলোর মধ্যে একটি হলো ইতিহাসের সবচেয়ে ধনী এবং সবচেয়ে শক্তিশালী দেশটিতে এতদিন পরেও শিশু দারিদ্র্যের হার স্তম্ভিত করার মতো। প্রেসিডেন্ট বাইডেনেরে ১ দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন ডলারের ‘আমেরিকা উদ্ধার পরিকল্পনায়’ গত বুধবার দেশটির আইনসভা চূড়ান্ত অনমোদন দেওয়ার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র এই ক্ষত সারিয়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

এই প্যাকেজের সবচেয়ে ঐতিহাসিক বিষয়টি হলো এখানে এমন কিছু বিধান রাখা হয়েছে যার মাধ্যমে দ্রুত শিশু-দারিদ্র্য হ্রাস পাওয়া উচিত। কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের করা একটি গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, প্রণোদনা প্যাকেজে নেওয়া এসব পদক্ষেপ যদি স্থায়ীরূপ পায় তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের শিশু-দারিদ্র্য অর্ধেকে কমে আসবে। বাইডেনের ঐতিহাসিক এই পদক্ষেপ কার্যকর হলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবীণদের সামাজিক নিরাপত্তার জন্য সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্ট যা করেছিলেন এটা হবে তার সঙ্গে তুলনীয়।

বাইডেন প্রশাসনের নেওয়া এই পদক্ষেপ আমেরিকান নীতিতে বৈপ্লবিক এক পরিবর্তন এনেছে এবং এর মাধ্যমে এটা তুলে ধরা হয়েছে যে, দরিদ্র শিশুদের জন্য সমাজের সব স্তরের মানুষের বিনিয়োগ করার এক ধরনের দায় রয়েছে। আর এর মাধ্যমে যে ফল পাওয়া যাবে তা বোঝার জন্য বিশ্বের অন্য দেশের দিকে এবার তাকানো যাক।

অর্ধশতাব্দী আগে এই মার্চেই গণহত্যা, বিবাদ আর খাদ্য সংকটের মধ্য দিয়ে জন্ম হয়েছিল বাংলাদেশের। হেনরি কিসিঞ্জার (তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী) তখন বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি হিসেবে অভিহিত করেছিলেন এবং ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশের দুর্ভিক্ষের ভয়াবহ ছবিগুলো দেশটির হতাশাব্যঞ্জক ছবি তুলে ধরেছিল বিশ্বে।

১৯৯১ সালে বাংলাদেশে এক প্রলয়ঙ্কারী ঘূর্ণিঝড়ে লক্ষাধিক মানুষের প্রাণহানির খবর সংগ্রহ করার পর আমি নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে লিখেছিলাম, ‘বাংলাদেশ অত্যন্ত দুর্ভাগা একটি দেশ।’ শুধু জলবায়ু পরিবর্তন নয় বাংলাদেশ অনেক চ্যালেঞ্জের মুখে থাকায় আমি তখন ঠিকই বলেছিলাম। কিন্তু আমার অনুমান ভুল প্রমাণিত করে গত তিন দশকে বাংলাদেশ অভাবনীয় উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জন করেছে।

বিশ্বব্যাংকের মতে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার অবিচ্ছিন্নভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বর্তমান মহামারির আগের চার বছর ধরে দেশটির অর্থনীতি প্রতি বছরে ৭ থেকে ৮ শতাংশ বেড়েছে; যা চীনের চেয়েও দ্রুততর।

বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশিত গড় আয়ু এখন ৭২ বছর। যুক্তরাষ্ট্রের মিসিসিপি অঙ্গরাজ্যের দশটি কাউন্টির চেয়েও যা বেশি। বাংলাদেশ এক সময় হতাশার প্রতিমূর্তি হয়ে উঠলেও কীভাবে উন্নতি করতে হয় বিশ্বকে সেই শিক্ষা দেওয়া যথেষ্ট উদাহরণ রয়েছে বাংলাদেশের। বাংলাদেশে এই উন্নয়নের গোপন রহস্য শিক্ষা নারী অগ্রগতি।

বিগত শতাব্দীর আশির দশকে বাংলাদেশের দুই-তৃতীয়াংশ শিশু তাদের প্রাথমিক শিক্ষার পাঠ শেষ করতে পারতো না। তার আগেই ঝরে পড়তো। বিশেষ করে মেয়ে শিশুদের শিক্ষার হার ছিল খুবই কম এবং দেশটির অর্থনীতিতে নারীদের অবদান তেমন একটা ছিল না বললেই চলে।

এরপর সরকার ও নাগরিক সংগঠনগুলো নারীসহ সবাইকে শিক্ষা দেওয়ার প্রচারণা চালিয়ে শিক্ষার জন্য উৎসাহিত করেছে সবাইকে। এখন বাংলাদেশের ৯৮ শতাংশ শিশু তাদের প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করে। এক সময় দেশটিতে এমন লিঙ্গবৈষম্য থাকলেও বিস্ময়করভাবে সেই তফাত ঘুঁচে গেছে। বাংলাদেশের উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে এখন ছেলে শিক্ষার্থীর চেয়ে মেয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যাই বেশি।

বাংলাদেশ ও বিশ্বের অন্যান্য স্থানে ক্ষুদ্রঋণের প্রবক্তা ও শান্তিতে নোবেলজয়ী মোহাম্মদ ইউনূস আমাকে বলেছেন, ‘বাংলাদেশের সবচেয়ে নাটকীয় যে ঘটনাটি ঘটেছে সেটা হচ্ছে, নারীর মর্যাদা ও অবস্থার পরিবর্তন। আর এটা শুরু হয়েছে দরিদ্র নারীদের জীবনমানের উন্নয়নের মধ্য দিয়ে।

নারীদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার জন্য ইউনুসের প্রতিষ্ঠিত গ্রামীন ব্যাংকের মাধ্যমে মোবাইল ফোন সেবা বিক্রয়ের কারণে গত চার বছরে প্রায় এক লাখ নারীর কর্মসংস্থান হয়েছে। এটা তাদের যেমন স্বাবলম্বী করেছে তেমনি দেশের উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

বাংলাদেশ তার নারী জনগোষ্ঠীকে শিক্ষিত করেছে। তাদের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করেছে। আজ সেই নারীরাই দেশটির অর্থনীতির খুঁটি। তারাই এখন অর্থনৈতিক উন্নয়নের ভিত্তি হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প নারীদের জন্য একটা বড় সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। যে শার্টটি আপনি এখন পরে আছেন, হতে পারে সেটা বাংলাদেশের কোনো নারীর তৈরি। বাংলাদেশ চীনের পর বৃহত্তম তৈরি পোশাক শিল্প রফতানিকারক দেশ।

তবে পশ্চিমা মানদণ্ড অনুযায়ী বাংলাদেশের শ্রমিকদের মজুরি দেওয়া হয় না। নিপীড়ন এবং যৌন হয়রানির মতো সমস্যাগুলো রয়েছে। এছাড়াও রয়েছে আগুনের ঝুঁকি ও অন্যান্য নিরাপত্তা সমস্যা। এইতো ২০১৩ সালে দেশটির এক তৈরি পোশাক কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে ১ হাজার ১০০ এর বেশি পোশাক শ্রমিকের প্রাণহানি হয়েছিল।

কিন্তু এসব পোশাক শ্রমিকই আবার বলছেন যে, ১৪ বছর বয়সে বিয়ে কিংবা ফসলের ক্ষেতে কাজ করার চেয়ে এ ধরনের চাকরি অনেক ভালো। দেশটির শ্রমিক ইউনিয়নগুলো এবং নাগরিক সমাজ শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য চাপ দিয়ে আসছে। অনেক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও দেশটিতে শ্রমিক সুরক্ষায় বেশ কাজ হয়েছে।

বাংলাদেশের শিক্ষিত নারীরা এখন গ্রামীণ ব্যাংক এবং সমধিক প্রশংসিত আরেক বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের মতো প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদে কাজ করছেন। শিশুদের টিকা দিচ্ছেন নারীরা। মানুষকে টয়লেট ব্যবহারে সচেতন করে তোলার কাজটিও করছেন তারা। একই তারা গ্রামের নিরক্ষর মানুষকে পড়তে শিখিয়েছেন। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে জন্মনিয়ন্ত্রণ-পদ্ধতি ব্যাখ্যা দিয়ে বোঝাচ্ছেন। বাল্যবিবাহকে নিরুৎসাহিত করার কাজও করেছেন।

বাংলাদেশে মহান কোনো রাজনৈতিক নেতা নেই। কিন্তু তারপরও মানবসম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগ করে বাংলাদেশ তার সমাজের অভ্যন্তরে যে গতিধারার সৃষ্টি করেছে, আমরা সবাই সেখান থেকে শিক্ষা নিতে পারি।

বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে ‘দারিদ্র্য বিমোচনের অনুপ্রেরণার আখ্যান’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। বিগত ১৫ বছরে আড়াই কোটি বাংলাদেশি দারিদ্র্যমুক্ত হয়েছেন। ১৯৯১ সাল থেকে বাংলাদেশে অপুষ্টিতে ভোগা শিশুর সংখ্যা প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে; যা এখন তাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতের চেয়েও কম।

আপনাদের মধ্যে যেসব পাঠক সন্দেহবাতিক তারা এমন কথা শুনে হয়তো মাথা নেড়ে ভাবছেন, জনসংখ্যার আধিক্য দেশটির উন্নয়নের গতি আটকে দেবে। কিন্ত প্রকৃত বিষয়টি হলো, বাংলাদেশের নারীদের এখন গড়ে প্রত্যেকের মাত্র দুটি সন্তান রয়েছে। অথচ আগে এই সংখ্যাটা ছিল অনেক বেশি; গড়ে সাত জন।

অল্প কথায় বলতে গেলে, বাংলাদেশ তার সবচেয়ে অবহেলিত সম্পদ অর্থাৎ তার দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ওপর বিনিয়োগ করেছে, মনযোগ দিয়েছে সবচেয়ে প্রান্তিক ও সবচেয়ে কম উৎপাদনশীল জনগোষ্ঠী ওপর। আর যে কারণেই এখান থেকে সবচেয়ে বেশি ফল পেয়েছে। আমেরিকার ক্ষেত্রে যা সত্য। আমরা আমাদের শতকোটিপতিদেরকে আরও বেশি উৎপাদনশীলতার জন্য চাপ দিতে পারি না কিন্তু আমরা যত আমেরিকার প্রতি সাতটি শিশুর মধ্যে একজনের ঝড়ে পরা আটকাতে পারি তাহলে দেশ ব্যাপকবাবে উপকৃত হবে।

শিশু-দারিদ্র্য নির্মূলে বাইডেনের নেওয়া আগ্রাসী পদক্ষেপ হয়তো সেটা করে দেখাতে পারে। করের অর্থ থেকে ফেরতযোগ্য শিশুঋণ স্থায়ী করা উচিত। বাংলাদেশ আমাদের এটা মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, প্রান্তিক শিশুদের ওপর বিনিয়োগ শুধু করুণ বা সমবেদনার বিষয় নয় এটা একটা জাতিকে উন্নতির পথে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে।