বর্ডারে মিসিং সিম বন্ধ করল কে, জানতে চান নিহতের স্ত্রী

প্রকাশিত: মার্চ ৭, ২০২১

মুসলিম নারীকে ভালোবেসে বিয়ে করেন প্রফেসর নিরঞ্জন শীল নিরু। ধর্ম পরিবর্তন করে নাম ধারণ করেন নিরু রায়হান। কিন্তু বাবার রেখে যাওয়া সম্পত্তির ভাগ চাইতে গিয়ে খুন হতে হলো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এই প্রফেসরকে। সংবাদ সম্মেলনে এ অভিযোগ করেছেন নিহতের স্ত্রী সৈয়দা শাহিন আক্তার। আদালতের নির্দেশে সোমবার (৮ মার্চ) তোলা হবে তার লাশ।

মামলার সুষ্ঠু তদন্ত ও হত্যাকারীদের গ্রেফতার দাবিতে রোববার (৭ মার্চ) দুপুর ১২টায় বরিশাল রিপোর্টার্স ইউনিটিতে এ সংবাদ সম্মেলন করেন নিহতের স্ত্রী এনজিওকর্মী সৈয়দা শাহিন আক্তার।

নিরু রায়হানকে পরিকল্পিতভাবে তার আপন ভাইয়েরা হত্যা করেছে উল্লেখ করে সৈয়দা শাহিন আক্তার বলেন, চট্টগ্রামের একটি এনজিওতে চাকরির সুবাদে তার সঙ্গে পরিচয় হয়। ওই সময়ে নিরঞ্জন শীল নিরু হিন্দু ধর্মের ছিলেন। পরবর্তীতে ২০০১ সালে নিরঞ্জন শীল নিরু ইসলাম ধর্মগ্রহণ করে তাকে বিয়ে করেন। তাদের এক ছেলে রয়েছে।

নিরু রায়হানের (নিরঞ্জন শীল নিরু) তিন ভাই অমল চন্দ্র শীল, বিমল চন্দ্র শীল, মনোরঞ্জন শীল। ৫ বছর ধরে নিরু রায়হানের সঙ্গে ভাইদের জমি নিয়ে বিরোধ চলে আসছিল।

সৈয়দা শাহিন আক্তার দাবি করেন, তারা কোনোভাবেই আমার স্বামীর সম্পত্তি বুঝিয়ে দিতে রাজি ছিল না। অথচ নিরু রায়হান তার বাবার রেখে যাওয়া সম্পত্তিতে তার নামে বিএস পর্চা ও গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে।

২০১৮ সাল থেকে ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মোট ৬ বার নিরু রায়হান তার নিজ বাড়ি বরিশালের উজিরপুর উপজেলার ধামুরা বন্দর গজেন্দ্র গ্রামে আসেন। এ সময়ে ভাইদের সঙ্গে জমি নিয়ে মারামারির ঘটনাও ঘটে।

২০১৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি বাড়িতে গিয়ে ২২ দিন থেকে ভাইদের সঙ্গে জমি নিয়ে বিরোধের সালিস করেন। এ সময়ে তার ভাইয়েরা নিরু রায়হানের জমি কিনে রাখতে চাইলে তিনি রাজি হন। তখন ১ কোটি টাকায় জমি বায়নার চুক্তি হয়।

সৈয়দা শাহিন আক্তার বলেন, চুক্তির মধ্যে প্রথমে ২২ লাখ টাকা দেওয়ার কথা বলে বাড়ি যেতে বলেন তার ভাইয়েরা। বাকি টাকা ১ বছর ধরে পর্যায়ক্রমে দেবে। ভাইদের আশ্বাসে ২০১৯ সালের ১৭ এপ্রিল নিরু রায়হান জমি বিক্রির ২২ লাখ টাকা নিতে উজিরপুরে আসেন। সেখানে অবস্থানকালে ২১ এপ্রিল নিরু রায়হানের ছোট ভাই মনোরঞ্জন শীল তাকে ফোন করে জানায় ভাই মারা গেছেন।

তিনি অভিযোগ করেন, আমি স্বামীকে দেখতে শ্বশুরবাড়ি আসার আগেই তার দাফন সম্পন্ন করে তারা। ঘটনার ১২ দিন পর আমার স্বামীর মানিব্যাগে থাকা ভোটার আইডি কার্ড, এটিএম কার্ড, ইউনিভার্সিটির আইডি কার্ড, সঙ্গে থাকা ৮০ হাজার টাকা, ব্যাংকের পাস বই, ফোন ও সিম চাইলে দেবর মনোরঞ্জন শীল ও ভাগনে সুশান্ত শীল জানায় তারা এগুলো পায়নি।

মনোরঞ্জন শীল ও সুশান্ত শীল বলেন, সম্ভবত এগুলো ভারতের বর্ডারে মিসিং হয়েছে। কারণ নিরু রায়হান সেবার ভারত ভ্রমণ শেষে বরিশালের উজিরপুরে নিজ বাড়িতে আসছিলেন।

বিষয়টি সন্দেহ হলে সৈয়দা শাহিন আক্তার তার পরিচিত এক পুলিশ কর্মকর্তার মাধ্যমে স্বামীর মৃত্যুর আগের রাতের কললিস্ট তুলে দেখতে পান সেইরাতে নিরু রায়হান তার সহকর্মী মোতালেব, বন্ধু মাহবুবের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ কথা বলেছেন। তার ব্যবহৃত সিম দিয়ে আমার দেবর মনোরঞ্জন ও ভাসুরের ছেলে অঞ্জন শীলের সঙ্গে কথা বলেন।

শাহিন আক্তার বলেন, আমার স্বামী মারা যান ২১ এপ্রিল বিকেল ৩টা ৪৪ মিনিটে। অথচ তার ব্যবহৃত সিম বন্ধ হয় সেদিন বিকেল ৫টা ৪৫ মিনিটে। সিমটি ওই বাড়িতে বসেই বন্ধ করা হয়।

মারা যাওয়ার দুই ঘণ্টা পর নিরু রায়হান কীভাবে সিম বন্ধ করল? প্রশ্ন তুলে শাহিন আক্তার বলেন, শ্বশুরবাড়ির লোকজন চেয়ারম্যানের কাছ থেকে স্ত্রীর নাম খালি রেখে মৃত্যুর সনদপত্র তোলেন। নিরু বিয়ে করেনি, কোনো ওয়ারিশ নেই; এমনটা বুঝিয়ে তারা সম্পত্তি দখল করতেই এই কাজ করেছেন। মূলত তারা সম্পত্তির জন্য আমার স্বামীকে হত্যা করেছেন।

বিচার চেয়ে ২০২০ সালের ১২ অক্টোবর বরিশাল সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ৮ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন শাহিন আক্তার।

আসামিরা হলেন অমল চন্দ্র শীল, বিমল চন্দ্র শীল, মনোরঞ্জন শীল, সুশান্ত শীল শান্ত, কনা রানী শীল, মিথুন জয় দীপ, অর্পিতা রানী টুম্পা, অঞ্জন শীল। মামলাটি সিআইডি তদন্ত করছে। এদিকে নিহত নিরু রায়হানের ভাই মনোরঞ্জন শীল আগৈলঝাড়ার যুব উন্নয়ন অফিসে কর্মরত ছিলেন। হত্যা মামলায় আসামি হওয়ার পরে চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন।

নিহতের স্ত্রী বলেন, তারা আমার স্বামীকে হত্যা করেছে। সেজন্য মামলা করার পর দেশ ছেড়ে ভারত পালানোর জন্য চাকরি ছেড়েছে। এ সময়ে সৈয়দা শাহিন আক্তার হত্যাকারীদের ফাঁসির দাবি করেন।

প্রসঙ্গত, নিরু রায়হান ইবাইস বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। তার ১৫ বছরের ছেলের নাম অর্নিবাণ পৃথিবী বর্ণ।