দেশের সেরা ৫ ইউটিউবার

প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১৯, ২০২১

বতর্মান সময়কে বলা হয় ভিডিওর যুগ। এজন্য ইউটিউবের জনপ্রিয়তা বাড়ছে ব্যাপক হারে। শিক্ষা, খেলা, বিনোদন, সংবাদ, প্রযুক্তি, সাজসজ্জা, ভ্রমণ ও রান্না থেকে শুরু করে প্রায় সব ধরনের ভিডিও রয়েছে এই স্ট্রিমিং প্লাটফর্মে। তাই বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশের ইউটিউব চ্যানেলগুলোও এগিয়ে যাচ্ছে তাদের প্রশংসনীয় কার্যক্রম দিয়ে। যাদের মধ্যে এখন অনেকেই রীতিমতো জনপ্রিয় তারকা। এমনই কয়েকজন ইউটিউবারদের সঙ্গে কথা বলে বিস্তারিত লিখেছেন জুনায়েদ হাবীব।

ছোটবেলা থেকে মোবাইল ও ক্যামেরা নিয়ে নানা কারসাজি দেখাতে চেষ্টা করতেন তৌহিদ আফ্রিদী। পড়াশোনার ফাঁকে কম মূল্যের একটি ক্যামেরাতে ঘুরত তার স্বপ্নের চাকা। খুব চঞ্চল স্বভাবের হওয়াতে বাইরে যতটা দুরন্তপনায় থাকতে পারত ঠিক বাসায় ছিল এর অনেকটা ব্যতিক্রম। কারণ তার বাবা মাইটিভির চেয়ারম্যান নাসির উদ্দিন সাথী ছিলেন অত্যন্ত কঠোর একজন মানুষ। যে কারণে সবসময় ছেলেকে শাসনে রাখতেন। তবে সবার কোনোরকম স্নেহের কমতি ছিল না।

সেই তৌহিদ আফ্রিদী এখন লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে পরিচিত নাম। শুধু তাই নয়, রীতিমতো এ তরুণ গোটা দেশ ছাপিয়ে ভ্লগ দিয়ে বিশ্বের অনেক প্রান্তে বাংলাদেশের পতাকাকে আরও সমৃদ্ধ করছেন। এক শিল্প পরিবারের সন্তান হয়েও কখনও স্বপ্ন পূরণে পরিবারের কাউকেই এগিয়ে আসতে দেননি। বরং আফ্রীদি প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে গেছেন নিজ চেষ্টায় কিছু করার। ২০১৫ সালে বাংলাদেশি ইউটিউবে কোনও ভ্লগ ছিল না। সেসময়ে তিনি ভাবলেন এমনই ব্যতিক্রম কিছু দিয়ে শুরু করবেন তার স্বপ্নের ইউটিউব যাত্রা।

তৌহিদ আফ্রিদী বলেন, ‘ছোটবেলা সবকিছু নিয়ে অনেক ঘাটাঘাটি করতাম। অনেক আগে থেকেই বাইরের ইউটিউব ভ্লগারদের দেখতাম নিয়মিত। তাদের ভ্লগ দেখে ভাবলাম বাংলাদেশে যেহেতু এখনেও কেউ ভ্লগ ভালোভাবে শুরু করেনি তাই আমার মাধ্যমেই এর সূচনা হোক। ইউটিউবের জন্য যখন নতুন নতুন ভিডিও করতে হত তখন আমার কাছে অনেক দামি ক্যামেরা ছিল না। খুব অল্প দামের এক ক্যামেরা নিয়েই ভিডিও করতে হত। তবুও বাবার কাছে আবদার করিনি দামি ক্যামেরা লাগবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এভাবেই বিভিন্ন ভ্লগ কন্টেন্ট তৈরি করতে থাকলাম। দিনশেষে যখন দর্শকপ্রিয়তা একটু একটু করে বাড়ছিল। তখন নিজেকে বুঝতে শুরু করলাম। আরও সময় দেওয়া শুরু করলার ইউটিউবের জন্য। সেই থেকে বাবাও হয়ে যান আমার একজন সাপোর্টার। বাবার মতো কেউ আমার পাশে থাকা সেটাই অনেক বড় শক্তি ছিল।’

ইউটিউবে প্রায় ৩ মিলিয়ন সাবস্ক্রাইবার তৌহিদ আফ্রিদীর চ্যানেলের। দেশের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়িয়ে সবুজ ভূমিকে ক্যামেরাবন্দি করেন তিনি। যা ইউটিউবে প্রকাশ করলেই কোটি কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। এছাড়াও বিভিন্ন শর্টফ্লিম বানিয়েও বেশ সাড়া পাচ্ছেন তিনি।

অনলাইন শিক্ষক আয়মান সাদিক
২০১৫ সালের কথা। আয়মান সাদিক তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইবিএতে পড়ছিলেন। পাশাপাশি এক কোচিংয়ে শিক্ষকতা করতেন। কোচিংয়ে দেশের নানা প্রান্ত থেকে ছুটে আসত শিক্ষার্থীরা। যাদের মধ্যে অনেকেরই আর্থিক স্বচ্ছলতা ছিল না।

একদিন এক শিক্ষার্থী আয়মানকে জানালেন ৭ হাজার টাকা নিয়ে ঢাকায় এসেছে। কিন্তু কোচিংয়ের ফি ১৩ হাজার টাকা। সেদিন থেকে ব্যতিক্রমী কিছু করা নিয়ে ভাবতে থাকেন তিনি। একটি আইডিয়া তার মাথায় আসে তার। অনলাইনে ব্যতিক্রমী স্কুল প্রতিষ্ঠা করে বসেন । সঙ্গে তার সহযোগী ছিলেন ছোটভাই সাদমান সাদিক।

টেন মিনিট স্কুলের একটি ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব চ্যানেল খোলেন। যেখানে পোস্ট করেন পাঠ্যন্তর্ভুক্ত ও জীবন দক্ষতা বিষয়ক শিক্ষার ভিডিও। এছাড়া শুরু করেন জেএসসি, এসএসসি, এইচএসসি, ভর্তি পরীক্ষা, স্কিল ডেভেলপমেন্ট, মডেল টেস্ট নিয়ে লাইভ ক্লাস। জেএসসি, এসএসসি, এইচএসসির সব বিষয়ের বিনামূল্যে অনলাইনে পাঠদান করেন তারা।

বর্তমানে ইউটিউব চ্যানেলটি ২ মিলিয়ন সাবস্ক্রাইবার অতিক্রম করেছে। এছাড়াও আয়মান সাদিকের নিজস্ব আরেকটি মোটিভেশনাল ইউটিউব চ্যানেলে প্রায় ৮০ হাজার সাবস্ক্রাইবার রয়েছে। টেন মিনিট স্কুলের ব্যাপারে আয়মান সাদিক বললেন, ‘শুরুতে আমরা তেমন সাড়া পাইনি। তবে কয়েক মাস পর পরিচিত বহু গুনে বৃদ্ধি পেতে থাকে। তবে একটা বিষয় যে এখন পর্যন্ত টেন মিনিট স্কুল নিয়ে আমাদের কোনও নেতিবাচক কথা শুনতে হয়নি। আমাদের কাজ নিয়ে খুবই অসাধারণ রেসপন্স পাচ্ছি।

তিনি আরও বলেন, ‘সকালে হাঁটতে বের হলে অনেকে কাছে ছুটে এসে মিষ্টি খাইয়ে ‍যান। জানান তিনি চাকরি পেয়েছেন। টেন মিনিট স্কুলের ইন্টারভিউ প্রিপারেশন ভ্লগ দেখে প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। কখনও বিভিন্ন জেলায় অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত হলে সেখানে অনেকেই আমাকে দেখে আবেগআপ্লুত হয়ে পড়েন। সত্যিই এসব ব্যাপারগুলো আমাকে আরও বেশি কাজ করতে অনুপ্রেরণা জোগায়।’

আমজনতার শামীম হাসান সরকার
বর্তমান সময়ের অন্যতম জনপ্রিয় টিভি অভিনেতা শামীম হাসান সরকার। ইউটিউব দিয়ে শুরু এবং পরবর্তীতে অভিনয় জগতে প্রবেশ। ইউটিউবে তার জনপ্রিয় চ্যানেল ‘ম্যাংগো স্কোয়াড’-এর লিডার তিনি। ছোট পর্দায় নিয়মিত অভিনয়ের পাশাপাশি মিলেছে সফল ইউটিউবারের তকমা।

এইচএসসি পাসের পর মিলিটারি ইন্সটিটিউট অব সায়েন্স এন্ড টেকনোলজি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং এ পড়ালেখা করেন শামীম। তারপর কিছুদিন চাকরি করে মালেশিয়ার একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মার্স্টাস সম্পন্ন করেন।

নানামুখী প্রতিভায় বিকশিত এ তরুণ মানুষকে হাসিয়ে তৃপ্তি পান। ২০১৪ সালের ১৩ই অক্টোবর শামীমের ‘ম্যাংগো স্কোয়াড’-এর যাত্রা শুরু। সেখানে সমাজের আমজনতাদের নিয়ে বিভিন্ন হাস্যরসিক ভিডিও কন্টেন্টের মাধ্যমে তিনিও জনপ্রিয়তায় আসেন।

শামিম হাসান সরকার বলেন, ‘ম্যাংগো স্কোয়াডের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে হাস্যরসের মাধ্যমে মানুষের কাছে সচেতনতা মূলক বার্তা পৌঁছে দেওয়া। কারণ সিরিয়াস কথাবার্তা মানুষ শুনতে চায় না। তাই যদি হাস্যরসের মাধ্যমে মানুষকে সচেতন করা যায় তবে সেটি অধিক কার্যকর হতে পারে।’

প্রযুক্তির বন্ধু তুষারের টোটো কোম্পানি!
বাংলাদেশের প্রযুক্তিপ্রেমীদের কাছে অ‌্যান্ড্রয়েড টোটো কোম্পানি (এটিসি) অত্যন্ত পরিচিত একটি নাম। মূলত তাদের সোজাসাপ্টা কথাবার্তাই দর্শকদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। এ ইউটিউব চ্যানেলের অন্যতম কর্ণধার আশিকুর রহমান তুষার। এটিসির যাত্রা শুরু হয় ফেসবুক গ্রুপ খোলার মাধ্যমে। ২০১৩ সালের শেষের দিকে, প্রায় ছয় বছর আগে।

তুষার ও তার কয়েকজন বন্ধু মিলে এ গ্রুপটি খোলেন। সেই গ্রুপের প্রত্যেকেই খুব সাধারণ ঘরের ছেলে। তারা প্রথমদিকে একেবারেই শখের বশে কাজটি শুরু করেছিলেন। নিজেদের কোনও অফিস বা স্টুডিও না থাকায় সারাদিন টো টো করে ঘুরে বেরিয়ে ভিডিও শ্যুট করতেন। সেই থেকে তাদের ইউটিউব চ্যানেলের নাম নির্ধারণ করেন টোটো কোম্পানি।

ফেসবুক গ্রুপসহ এ চ্যানেলটি তারা ২০১৪ সালে শুরু করেন। তখন রিভিউ করার জন্য মিরপুর শাহ আলী প্লাজায় মোবাইলের দোকানগুলোতে গিয়ে দোকান মালিকদের থেকে অল্প কিছুক্ষণ ভিডিও করার জন্য ফোন চেয়ে নিতেন। তাদের দোকানেই ফোন বের করে ভিডিও করতেন। এভাবেই তাদের কার্যক্রম শুরু হতে থাকে।

এরপর ধীরে ধীরে দেশীয় মোবাইল কোম্পানিগুলো রিভিউ করার জন্য ডিভাইস পাঠাতে শুরু করে। এখন তারা ইন্টারন্যাশনাল ফোন বিক্রয় প্রতিষ্ঠান থেকেও রিভিউ ইউনিট পান। ৪৫০ এর বেশি ভিডিও বানিয়েছে এটিসি। বর্তমানে তাদের চ্যানেলে প্রায় সাত লাখ আশি হাজার সাবস্ক্রাইবার সক্রিয় রয়েছে।

তুষার বলেন, ‘এতদূর আসতে গিয়ে অনেক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হয়েছে আমাদের। প্রথম অবস্থায় রিভিউ ইউনিট ম্যানেজ করা অনেক কঠিন ছিল। সবসময় নিজেদের পকেটের টাকা দিয়ে ফোন কিনে বা শপে গিয়ে ফোন নিয়ে রিভিউ বানানো সম্ভব না। প্রায় এক দেড় বছর ধরে মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলো রিভিউ ইউনিট দেয়ার ফলে এ সমস্যা আর হয় না।’

এটিসির ভবিষ্যত পরিকল্পনার কথা বলতে গিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘একটি পরিপূর্ণ টেক কমিউনিটি গড়ে তোলা আমাদের উদ্দেশ্যে। যেখানে ইউটিউব ভিডিওর পাশাপাশি রিটেন ব্লগ, পডকাস্ট, টেক নিউজ, ফেসবুক গ্রুপ সবকিছুই থাকবে।’

ক্লাস শেষে বার্গার কিং-এ ঢুঁ মারতে যেয়েই ইফতেখার রাফসানের ইউটিউব জগতে যাত্রা শুরু। ২০১৭ সালে বার্গার কিং- এর রিভিউ দেওয়ার পর ২ বছরের লম্বা বিরতিতে চলে যান তিনি। শুরুটা ফুড ভ্লগিং দিয়ে হলেও নিজেকে ফুড ভ্লগার বলতে নারাজ রাফসান। মাত্র ৫-৬ হাজার সাবস্ক্রাইবার নিয়ে শুরু ‘রাফসান দ্য ছোটভাই’ চ্যানেলের। যার সংখ্যা এখন ১ লাখ ৬৭ হাজার!

রিভিউতে আসার গল্প উল্লেখ করতে গিয়ে রাফসান বলেন, ‘খাবারের প্রতি আলাদা ঝোঁক থাকার কারণে এই কাজটি বেশি করা হয়। ভালোকে ভালো, খারাপকে খারাপ বলার মানসিকতা নিয়ে ফুড রিভিউ শুরু করেছিলাম আমি। তবে এ নিয়ে কম বেগ পেতে হয়নি। রেস্টুরেন্টে বসে ভিডিও করতে না দেওয়ায় ফুটপাতে বসে রিভিউ দিতে হয়েছে। এক জায়গা থেকে তো রীতিমতো গলাধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়া হয়েছিল আমাকে।’

খারাপ অভিজ্ঞতা থাকলেও ভালো ঘটনার ভাণ্ডারও কম না। রাফসানের সঙ্গে দেখা করার জন্য এক খুদে ভক্ত সুদূর সিলেট থেকে ঢাকায় ছুটে এসেছিল বলেও জানান তিনি। এসব কিছুর পাশাপাশি একজন প্রফেশনাল গেইমারও রাফসান।