পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্যে আলজাজিরার রিপোর্ট মিথ্যা, মানহানিকর

প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ৩, ২০২১

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরায় প্রকাশিত ‘অল দ্য প্রাইম মিনিস্টারস মেন’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদনকে ‘মিথ্যা ও মানহানিকর’ হিসেবে বর্ণনা করেছে বাংলাদেশ সরকার। সোমবার রাতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, কিছু ‘উগ্রপন্থী ও তাদের সহযোগী, যারা লন্ডন এবং বিভিন্ন জায়গায় থেকে এসব করছে’, তাদের এই ‘বেপরোয়া অপপ্রচারকে’ বাংলাদেশ সরকার প্রত্যাখ্যান করছে। খবর বিডিনিউজ ও বাংলানিউজের।

‘এই প্রতিবেদন একগুচ্ছ বিভ্রান্তিকর শ্লেষ আর বক্র ইঙ্গিত ছাড়া আর কিছু নয়, যা আসলে চরমপন্থী গোষ্ঠী জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কুখ্যাত কিছু ব্যক্তির দ্বারা পরিচালিত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ‘অপপ্রচার’, যারা ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এ রাষ্ট্রের প্রগতিশীল ও অসাম্প্রদায়িক নীতির বিরোধিতা করে আসছে। ‘এই প্রতিবেদনে ১৯৭১ সালের নৃশংস গণহত্যার কথা এমনকি উল্লেখও করা হয়নি। জামায়াতের অপরাধীরা সে সময় লাখ লাখ বেসামরিক বাঙালীকে হত্যা করে এবং দুই লাখের বেশি নারীকে ধর্ষণ করে। এটা আল জাজিরা এবং তাদের প্রতিবেদনের প্রধান ভাষ্যকার ডেভিড বার্গম্যানের রাজনৈতিক পক্ষপাতেরই প্রতিফলন, যে বার্গম্যান ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা নিয়ে চ্যালেঞ্জ করে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন।’ বিবৃতিতে বলা হয়, ‘আল জাজিরার প্রতিবেদনে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে, তার মূল সূত্র একজন সন্দেহভাজন আন্তর্জাতিক অপরাধী, যাকে আল জাজিরাই ‘সাইকোপ্যাথ’ আখ্যায়িত করেছে। প্রধানমন্ত্রী বা বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কোন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ওই ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতার সামান্যতম প্রমাণও সেখানে নেই। আর মানসিক ভারসাম্যহীন কারও কথার ভিত্তিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাওয়া একটি আন্তর্জাতিক নিউজ চ্যানেলের জন্য বড় ধরনের দায়িত্বহীনতার পরিচায়ক। ‘এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই যে জামায়াতে ইসলামীর মদতপুষ্ট কয়েকজন দি ত পলাতক অপরাধী এবং কুখ্যাত ব্যক্তি তাদের চিরাচরিত ছকে বাংলাদেশবিরোধী এই অপপ্রচার সাজিয়েছে, যারা আন্তর্জাতিক বিভিন্ন উগ্র গোষ্ঠী এবং সংবাদমাধ্যম, বিশেষ করে আল জাজিরার সঙ্গে যুক্ত হয়ে বিভিন্ন সময়ে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে।’ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ‘কিছু উগ্রপন্থী ও তাদের সহযোগী, যারা লন্ডন এবং বিভিন্ন জায়গায় থেকে এসব করছে, তাদের এই বেপরোয়া ‘অপপ্রচারকে’ বাংলাদেশ সরকার প্রত্যাখ্যান করছে। বাংলাদেশের অসাধারণ আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য যেখানে সরকারের ভূমিকা প্রমাণিত, সেই অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক সরকারকে কক্ষচ্যুত করার লক্ষ্য নিয়ে সাজানো হীন রাজনৈতিক ছক বাস্তবায়নে আল জাজিরা নিজেদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার সুযোগ দিচ্ছে, এটা হতাশাজনক।’

আল জাজিরাকে নিয়ে দেয়া বিবৃতি সবার উদ্দেশে-সচিব ॥ কাতারভিত্তিক টেলিভিশন নেটওয়ার্ক আল জাজিরায় ‘অল দ্য প্রাইম মিনিস্টার্স মেন’ শিরোনামে প্রচারিত প্রতিবেদন প্রসঙ্গে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে যে বিবৃতি দেয়া হয়েছে, সেটা সবার উদ্দেশে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন। মঙ্গলবার বিকেলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন পররাষ্ট্র সচিব। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদন নিয়ে যে বিবৃতি দেয়া হয়েছে, তা আল জাজিরার কাতার অফিসে পাঠানো হবে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে মাসুদ বিন মোমেন বলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে আল জাজিরাকে নিয়ে যে বিবৃতি দেয়া হয়েছে, সেটা সবার উদ্দেশে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, বিদেশী সাংবাদিকসহ সবার উদ্দেশে দেয়া। আইএসপিআর বা তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে বিবৃতি না দিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে কেন বিবৃতি দেয়া হলো এমন প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র সচিব বলেন, যেহেতু এখানে সরকার প্রধানকে ইঙ্গিত করা হয়েছে সেজন্য আমরা দিয়েছি। ১ ফেব্রুয়ারি আল জাজিরা নিউজ চ্যানেলে ‘অল দ্য প্রাইম মিনিস্টার্স মেন’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। আল জাজিরার প্রতিবেদনটিকে ভিত্তিহীন, বানোয়াট, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং রাজনৈতিক মদতপুষ্ট অপপ্রচার আখ্যায়িত করে তা প্রত্যাখ্যান করেছে বাংলাদেশ সরকার।

ভিত্তিহীন খবর প্রচারের শীর্ষে আল-জাজিরা ॥ ভিত্তিহীন, অসত্য ও মনগড়া সংবাদ প্রচারের অভিযোগে নানা সময় আল-জাজিরার সম্প্রচার বন্ধ করে দেয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ পারস্য উপসাগরীয় কয়েকটি দেশ কাতারভিত্তিক এ মিডিয়া নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদে মদত দেয়ার অভিযোগও তুলেছে। এছাড়া ভারতবিরোধী সংবাদ ও তথ্য উপস্থাপনের অভিযোগে ২০১৫ সালে দেশটিতে বন্ধ করে দেয়া হয় আল-জাজিরার সম্প্রচার। ১৯৯৬ সালে সম্প্রচার শুরুর পর থেকেই নানা সময় বিতর্কিত ও ভিত্তিহীন খবর প্রকাশের অভিযোগ ওঠে কাতারভিত্তিক টেলিভিশন নেটওয়ার্ক আল-জাজিরার বিরুদ্ধে। আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার ও আরব দেশগুলোতে সরকার পরিবর্তনের জন্য বিভিন্ন সময় চ্যানেলটিকে ব্যবহার করত কাতার সরকার। বিশেষ করে আরব বসন্তের সময় মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করতে বিক্ষোভকারীদের উস্কে দেয়ার অভিযোগ রয়েছে আল-জাজিরার বিরুদ্ধে। মিসরের উগ্ররাজনৈতিক দল মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে সম্পৃক্তর খবরও প্রকাশ হয়েছে বিভিন্ন সময়। ২০১৭ সালের ৫ জুন চ্যানেলটির বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদের সমর্থনের অভিযোগে কাতারের ওপর একযোগে অবরোধ আরোপ করে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিসর ও বাহরাইন। দাবি ওঠে টেলিভিশন চ্যানেলটি বন্ধ করে দেয়ার। এর আগে, ভুয়া সংবাদ প্রচারের অভিযোগে মিসরে আটক হন টেলিভিশন নেটওয়ার্কটির কয়েকজন সংবাদিক। ইরাক যুদ্ধের সময় বিতর্কিত সংবাদ প্রচারের অভিযোগে সাংবাদিকদের বহিষ্কার ও সম্প্রচার বন্ধ করে দেয়। জঙ্গীগোষ্ঠী আল-কায়দাকে সমর্থনের অভিযোগে ২০০৩ সালের সেপ্টেম্বরে স্পেনে আটক হন চ্যানেলটির এক সাংবাদিক। আন্দামান দ্বীপ ও জম্মু-কাশ্মীরকে বাদ রেখে ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্র তুলে ধরার অভিযোগে ২০১৫ সালের এপ্রিলে ৫ দিনের জন্য আল-জাজিরা টেলিভিশনের সম্প্রচার বন্ধ রাখা হয়। এছাড়া ভিত্তিহীন সংবাদ প্রচারের অভিযোগে বিভিন্ন সময় সম্প্রচার বন্ধ করে দেয় মালয়েশিয়া, আলজেরিয়া, সুদান, লিবিয়া ও কুয়েতসহ কয়েকটি দেশ। বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধ মামলার রায় নিয়ে খবর প্রকাশের সময়েও বিতর্কের জন্ম দেয় আল-জাজিরা। ফাঁসির দ প্রাপ্ত জামায়াত নেতাদের ইসলামিক স্কলার হিসেবে উল্লেখ করে চ্যানেলটি। জামায়াত নেতা মীর কাশেম আলীর বিদেশী লবিস্টে অবৈধভাবে অর্থপাচারের সঙ্গে আল-জাজিরার সম্পৃক্ততার প্রমাণ বলেও কোন ব্যবস্থা নেয়নি বাংলাদেশ সরকার। ২০১৩ সালে উগ্র ধর্মান্ধগোষ্ঠী হেফাজতের ইসলামের শাপলা চত্বর ঘেরাও কর্মসূচী নিয়েও উস্কানিমূলক খবর প্রকাশ করে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক চ্যানেল আল-জাজিরা।
News Source : The Daly Janakantha