গৃহকর্মীর আড়ালে মধ্যপ্রাচ্যে যৌনকর্মী পাঠানো হচ্ছে !

প্রকাশিত: নভেম্বর ২১, ২০১৯

একটু সুখের আশায় সাত সমুদ্র তের নদীর ওপারে পাড়ি জমান আমাদের দেশের অবলা হিসেবে পরিচিত নারীরা।কিন্তু প্রত্যাশিত প্রাপ্তি তো দূরে কথা, পৈতৃক জীবনটা নিয়ে ফেরাও অনেক সময় সম্ভব হয় না।অকথ্য নির্যাতনের মির্মম শিকার হয়ে অনেকে দেশে ফিরেন।মধ্যপ্রাচ্যে গৃহকর্মী পাঠানোর আড়ালে যৌনকর্মী পাঠাচ্ছে একশ্রেণীর আদম ব্যবসায়ী!

অভিবাসন নিয়ে কাজ করে এমন একটি বেসরকারি সংস্থা বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যে ধর্ষণসহ নানা ধরনের নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে এ বছর ৯০০ জনের মতো বাংলাদেশী নারী গৃহকর্মী দেশে ফেরত এসেছেন।সংস্থাটি আরো জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে নারী শ্রমিকদের মৃতদেহ দেশে আসার সংখ্যাও বেড়েছে। এই বিষয়টি খুবই উদ্বেগজনক। ফেরত আসা নারী শ্রমিকরা ধর্ষণসহ নানাভাবে নির্যাতিত হওয়ার অভিযোগ করছেন।

সরকারি কর্মকর্তারাও বলছেন, এসব অভিযোগের কিছুটা সত্যতা আছে। এ বছর সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশী নারী গৃহকর্মীর ৪৮ জনের লাশ দেশে এসেছে। তাদের মধ্যে ২০ জনই সৌদি আরবে নির্যাতনের অভিযোগ তুলে আত্মহত্যা করেছেন। ব্রাক বলেছে, ‘সৌদি আরবে গৃহকর্মীর কাজ করতে গিয়ে নির্যাতনের কারণে বাংলাদেশী নারীদের মৃত্যুর ঘটনাগুলোর কোনো বিচার হচ্ছে না।’ এতটা অমানবিক আচরণ কেন চেপে যাওয়া হচ্ছে, সে প্রশ্ন সচেতন মহলের্।

মধ্যপ্রাচ্যে কাজের জন্য যাওয়া নারীরা প্রায় প্রতিদিনই মধ্যপ্রাচ্য থেকে ফেরত আসছেন।যাদের ভালো কাজের প্রলোভন দেখিয়ে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে দালালদের মাধ্যমে মেনেজ করে পাঠায় একশ্রেণীর আদম ব্যাপারি।যারা যায়, তারা সরল মনে যায় কাজের বিনিময়ে আর্থিক সংকট মিটিয়ে একটু ভালো থাকার জন্য।কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে তারা হয় শরীরে নির্যাতনের ভয়াবহ চিহ্ন, না হয় লাশ হয়ে দেশে ফিরেছে।

ব্র্যাকের পরিসংখ্যানমতে, বিদেশে কাজ করতে গিয়ে গত তিন বছরে ৩৩১ নারী কর্মীর মৃত্যু হয়েছে।চলতি বছরের জুন মাস পর্যন্ত গত ছয় মাসে ৬০ নারী শ্রমিকের লাশ দেশে এসেছে। এর মধ্যে সৌদি-২৬, জর্ডান ৯, লেবানন ৯, আরব আমিরাত ৪, ওমান ৩ ও বিভিন্ন দেশ থেকে আরো ৯ নারীর লাশ দেশে এসেছে। এই সংখ্যার মধ্যে সৌদি আরবে ১০ নারী নির্যাতন সইতে না পেরে আত্মহত্যা করেন। আর ২০১৬ সালে ৫৭ জন, ২০১৭ সালে ১০২ এবং ২০১৮ সালে ১১২ জনের মৃত্যু হয়েছে।

ভাষাজ্ঞান এবং তাদের আচার-আচরণ সম্পর্কে ধারণা না-থাকা অর্ধশিক্ষিত নারীরা মধ্যপ্রাচ্য গিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েন। ভাষাজ্ঞান থাকলে যা থেকে অনেকটা রেহাই মিলত।কাজের অর্ডার দিলে না বোঝলে যা হয়, তার কুফল ভোগ করতে হয়েছে অবলা নারীদের।অনেকেই নাকি তাদের যৌন দাসি হিসেবে কিনে নেয়। আর বিক্রি করে দেয় আদম বেপারিদের লোকজন।নগদ পয়সা দিয়ে কিনে নেওয়ার পর ভাষাজ্ঞান না-থাকাদের উপর হায়নার মতো হামলে পড়ে মরুর জানায়োরসমরা।

নানাভা্বে সাবধান করার পরও অনেকে দালালদের খপ্পরে পড়ে সেসব দেশে গিয়ে বিপাকে পড়েন। দালালরাও নাকি তাদের যৌন নির্যাতন করে।নারীকর্মীসহ যাদেরই বিদেশে পাঠানো হয়, তাদের ওই দেশের ভাষাজ্ঞান সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা দিতে হবে। আর যে কাজে যাবে, সে ব্যাপারে অভিজ্ঞতা নিয়ে তবেই যেতে হবে। সর্বোপরি যে কাজে যাবে, সে কাজ সম্পর্কে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে শতভাগ নিশ্চিত হয়ে যেতে হবে।নানাভাবে তাহলে ঠকার আশঙ্কা অনেকটা কমে যাবে।

দালাল আর আদম ব্যবসায়ীদের খপ্পরে পড়ে আর যেন কোনো নারী মধ্যপ্রাচ্যে গিয়ে বিপাকে না পড়েন, সে জন্য প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়কে অধিক সতর্ক থাকতে হবে।যারা যাবে, তাদের দায়ও কম না। তারা শতভাগ নিশ্চিত না হয়ে আর যেন বিদেশে না যান। যাওয়ার আগে যে কাজে যাবে, সে কাজে দক্ষতা অর্জন এবং সে দেশের ভাষাজ্ঞান জানা জরুরি।জরুরি এ কাজগুলো সম্পর্কে আগাম সতর্ক থাকলে বিপদে-বিপাকে পড়ার আশঙ্কা থাকে না।

ভবিষ্যতে উল্লিখিত বিষয়গুলো নিশ্চিত হয়ে যেকোনো দেশে গেলে নির্যাতনের চিহ্ন বহন আর লাশ হয়ে দেশে ফেরার আশঙ্কা থাকবে না।বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশী মিশনগুলোকে এ ব্যাপারে আরো দায়িত্বশীল হতে হবে। তারা নাকি আসল কাজের চেয়ে অন্যদের খুশি করার কাজে বেশি ব্যস্ত থাকে।ফলে সে দেশে থাকা বাংলাদেশীরা এভাবে লাশ হয়ে ঘরে ফেরার মিছিল দীর্ঘ হবে না।গৃহকর্মীর আড়ালে কেউ যৌনকর্মী পাঠানোর দুঃসাহস পাবে না।

©মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম প্রধানের ফেসবুক থেকে প্রাপ্ত