২ যুবলীগ নেতার ২০ লক্ষ টাকার ভাইরাল হওয়ার ছবিটির আসল তথ্য ফাঁস।

প্রকাশিত: নভেম্বর ১২, ২০১৯

সাভার প্রতিনিধিঃ

৩১ অক্টোবর সকাল ১০টা ৫ মিনিট। যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির এক নেতার ফোন।
নিজের পরিচয় দিয়ে এ প্রতিবেদককে বললেন, ভাই আমি একটি ছবি পাঠাচ্ছি। দেখুন টাকা নিয়ে কিভাবে কবির উদ্দিন সরকার আশুলিয়া থানা যুবলীগের আহ্বায়ক হয়েছে। যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির দপ্তর সম্পাদক কাজী আনিসুর রহমান ও কবির উদ্দিন সরকারের কথোপকথের মাঝে প্রায় ২০ লাখ টাকার বান্ডেলের স্তুপসহ ছবি আছে, সেটা আপনাকে দিচ্ছি আপনি রিপোর্ট করলে বেশ তোলপাড় হবে। ঢাকার পার্শ্ববর্তী জেলার বাসিন্দা কেন্দ্রীয় যুবলীগের ওই নেতার সঙ্গে কথা বলার ৬ মিনিট পর হোয়াটসঅ্যাপে ছবিটি পাঠান তিনি।
ছবিটি দেখেই এ প্রতিবেদকের নিজেরও উত্তেজনা কাজ করে, লাখ লাখ টাকা সামনে রেখে কথা বলছেন যুবলীগ নেতা কাজী আনিস ও কবির সরকার! নিশ্চয়ই ভালো একটি নিউজ হবে। তাৎক্ষণিক বিষয়টি অবহিত করা হয় কালের কণ্ঠের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ও জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক মোস্তফা কামালকে। ছবিটি যাচাই বাছাই করেই নিউজটি করতে বলেন।

ছবিটি নিয়ে এ প্রতিবেদক রিপোর্ট করার জন্য প্রস্ততি নিতে থাকেন। কারণ যুবলীগের দপ্তর সম্পাদক কাজী আনিসুর রহমানের বিরুদ্ধে মোটা অংকের টাকা নিয়ে বিভিন্ন কমিটিতে যুবলীগের পদ বিক্রির অভিযোগ রয়েছে।

যুবলীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের একজন সামান্য অফিস সহকারী ৭ বছরের ব্যবধানে শত কোটি টাকার মালিক বনে যান। রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে ফ্ল্যাট, বাড়ি, গাড়ি, মার্কেটসহ সম্পদের পাহাড় গড়েন। শুদ্ধি অভিযান শুরুর পর দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান, দুদকের অনুসন্ধানে অবৈধ সম্পদের তথ্য প্রমাণাদি উঠে আসে এবং দুদক কাজী আনিস দম্পত্তির বিরুদ্ধে মামলাও করেন। সেই বিতর্কিত যুবলীগ নেতা কাজী আনিসের সঙ্গে আশুশিলা থানা যুবলীগের আহ্বায়ক কবির উদ্দিন সরকারের টাকাসহ ছবিটি দেখে কৌতুহল একটু বেশিই হয়।
এরপরই খোঁজ নেয়া হয় টাকাসহ ছবিটি আসল নাকি ভুয়া? বিভিন্ন সফটওয়ারের মাধ্যমে ছবিটি আসল কি না যাচাই করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু ভালো ফলাফল পাওয়া যাচ্ছিলো না। ছবির সত্যতা নিয়ে আশুলিয়া থানার বেশ কয়েকজন আওয়ামী লীগ এবং যুবলীগের নেতার সঙ্গেও কথা বলা হয়। কেউ বলছেন টাকাসহ ছবিটি আসল ছবি, কেউ কেউ বলেন ভুয়া ছবি। ওই পরিস্থিতিতে এ প্রতিবেদক আশুলিয়া যুবলীগের আহ্বায়ক কবির উদ্দিন সরকারের সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ করেন। টাকাসহ ছবিটি ভুয়া দাবি করে যুবলীগ নেতা কবির সরকার এবং দলীয় প্রতিপক্ষরা তার ইমেজ নষ্ট করতেই ছবি ফটোশপের মাধ্যমে বানিয়ে অপপ্রচার চালাচ্ছেন। কবির টাকা ছাড়া একটি ছবি পাঠান এই প্রতিবেদককে।
টাকা ছাড়া কবির উদ্দিন সরকারের পাঠানো ছবি আর কেন্দ্রীয় যুবলীগ নেতার পাঠানো ছবি দুটি নিয়ে কিছুটা দ্বন্দ্বে পড়তে হয়। তাহলে ভুয়া ছবি দিয়ে নিউজ করিয়ে ফায়দা লুটতে চায় যুবলীগ নেতা! কিছুটা ক্ষুদ্ধ হয়ে প্র প্রতিবেদক ফোন দেন সেই কেন্দ্রীয় যুবলীগের ওই নেতাকে। বলা হয়, আপনি ভুয়া ছবি পাঠিয়ে আরেক নেতার ক্ষতি করতে চান। যুবলীগের ওই নেতা কিছুটা বিব্রত হয়ে বলেন, না ভাই এটাতে আমার কোনো স্বার্থ নেই। সাভারের একজন নেতা ছবিটি দিয়েছেন। তাঁর দেয়া ছবিটিই আপনাকে দিয়েছি। ঠিক ১২টায় ফোন দেন সাভার উপজেলা যুবলীগের ওই নেতা। যিনি ছবিটি কেন্দ্রীয় যুবলীগ নেতাকে সরবরাহ করেছিলেন। ভুয়া ছবি দিয়ে কেন মানুষের ক্ষতি করাতে চাচ্ছেন? এমন প্রশ্নের জবাবে সাভার উপজেলা যুবলীগ নেতা বলেন, ভাই টাকাসহ ছবিটিই আসল, এডিট করে টাকা ফেলে দিয়ে কবির সরকার ওই ছবি পরে প্রচার করেছে। আসলে টাকাসহ ছবিটিই আসল। সাভার উপজেলা যুবলীগের এমন জোড়ালো দাবি শুনে কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েন এ প্রতিবেদক।
তাহলে কোন ছবিটি আসল? ওইদিনই যোগাযোগ করা হয় জার্মানির বিখ্যাত সাংবাদিক ও ফেক চেকার বিশেষজ্ঞ ইয়র্ন রেটেরিংয়ের সঙ্গে। দুটি ছবি পেয়ে ইয়র্ন রেটেরিং পরীক্ষা নিরীক্ষা করেন এবং পরদিন ১ নভেম্বর সকালে কালের কণ্ঠের এ প্রতিবেদককে ইয়র্ন রেটেরিং বলেন, আমি ছবি দুটি পরীক্ষা করে দেখছিলাম। টাকা পাশে নিয়ে ওই ব্যাক্তির ছবিটি সত্য নয়। প্রথমে আমি উভয় ছবিই (টাকা ছাড়া ও টাকাসহ) পরীক্ষার জন্য ফটোফরেনসিক্স ডট কমে দিলে কোনো ফলাফল পাইনি। ছবিটি হয়তো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে ডাউনলোড করার জন্য এমনটা হয়েছিলো! তারপর আমি ছবিতে ছায়া দেখতে পেলাম। টাকাগুলো বাঁ পাশ থেকে উজ্জ্বলতর দেখাচ্ছিল যদিও সেখানে (কক্ষে) বিশেষ কোনো আলোর উৎস ছিলো না। কিন্তু ইয়ানডেক্সে (রাশিয়ার একটি বহুল জনপ্রিয় সার্চ ইঞ্জিন যা মুখ সনাক্ত করতে সক্ষম) পরীক্ষা করলে ওই টাকার প্রকৃত উৎস সম্পর্কে আমি জানতে পারি।

তিনি আরও বলেন, ভিডিও থেকে সহজভাবে টাকার ছবিটি নিয়ে কাট করে ওখানে জুড়ে দেওয়া হয়েছে। ভিডিওতে তুমি টাকার ছবি দেখতে পারবে। হয়তো সেই ভিডিও চিত্রটি আসলে কোনো সংবাদ মাধ্যম থেকে নেওয়া ছবি? আমি একশতভাগ নিশ্চিত করে বলতে পারি ওই ছবির টাকার চিত্রটি পুরোপুরি মিথ্যা। কেউ টাকার ছবিটি ফটোশপের মাধ্যমে ওখানে (ওই ছবিতে) বসিয়ে দিয়েছে। আমার ধারণা এটি কোনো অপরাধের ঘটনায় পুলিশ কর্তৃক জব্দ করা কোনো টাকার ছবি এখানে যুক্ত করে দিয়েছেন।
জার্মানির সাংবাদিক ইয়র্ন রেটেরিংয়ের কাছ থেকে পাওয়া ভিডিও দেখে জানা যায়, ক্যাসিনো ব্যবসার মাধ্যধে কোটি কোটি টাকার মালিক বনে যাওয়া গেন্ডারিয়া থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি এনামুল হক এনু ও রুপন ভুইয়ার বাড়িতে গত ২৪ সেপ্টেম্বর র‍্যাব অভিযান চালিয়ে ৭৫০ ভরি স্বর্ণ এবং এক কোটি ৫ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়। সেই অভিযানে জব্দকৃত টাকার ভিডিওচিত্র থেকে ছবি কেটে কৌশলে কাজী আনিসুর ও কবির সরকারের সঙ্গে তোলা ছবিতে যুক্ত করে দেয়া হয়েছে।
ফেক চেকার বিশেষজ্ঞ ইয়ার্ন রেটোরিংয়ের কাছ থেকে ছবিটি ভুয়া বলে প্রমাণিত হয়েছে। প্রতিনিয়তই আমাদের কাছে নানা ধরনের ফেক ছবি দিয়ে একে অন্যের বিরুদ্ধে ছবিসহ বিভিন্ন তথ্য প্রমাণাদি দিয়ে নিউজ করার চেষ্টা চালায়, কিন্তু আমরা সত্য প্রকাশে অবিচল।-

সুত্র -কালের কন্ঠ ।