৭ই নভেম্বরের পর ক্ষমতার কেন্দ্রে চলে আসেন জিয়াউর রহমান

প্রকাশিত: নভেম্বর ৭, ২০২০

অনুরূপ আইচ : ১৯৭৫ এর ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি অন্যতম অধ্যায়। এটি কারো কাছে মুক্তিযোদ্ধা হত্যা দিবস। তথা শেখ মুজিব বিরোধীদের ক্ষমতা দখলের ইতিহাস। এদের কাছে এই দিন আবার জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে পালনীয়। শেখ মুজিব বিরোধী দলগুলো যতবারই বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় ছিল, তারা এই দিনকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় পালন করেছে। কথায় আছে, ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না। এখন বাংলাদেশের ইতিহাস আবার প্রতিটি পড়তে পড়তে জাতিরপিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জয়গাঁথা। অনেকটা বিলীন বা ম্রিয়মাণ হয়ে গেছে শেখ মুজিব বিরোধীরা। ধরে নেয়া হয়, শেখ মুজিব বিরোধী মানেই বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিপক্ষের শক্তি। তারা আজ কোণঠাসা।

যে কারণে, দীর্ঘ অনেক বছর ধরে জিয়াউর রহমানের গঠিত দল বিএনপি ৭ নভেম্বর উদযাপন করে আসছে অনাড়ম্বরভাবে। এবার তার ব্যত্যয় ঘটেনি। ইতিহাস পর্যালোচকদের একাধিক বক্তব্যে ৭ নভেম্বর সম্পর্কে যা জানা যায় তা হলো-
কিছু সেনা কর্মকর্তাদের দ্বারা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট নিহত হবার পর খন্দকার মোশতাক আহমেদ নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করেন। কিন্তু খন্দকার মোশতাকের ক্ষমতার নেপথ্যে ছিলেন ১৫ই অগাষ্টে শেখ মুজিবকে হত্যাকারীরা। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল খালেদ মোশাররফ (বীর উত্তম) এই ব্যাপারটি মেনে নিতে পারেননি। তিনি তার অনুগত সৈন্য বাহিনী নিয়ে ৩রা নভেম্বর মোশতাক সরকারের বিরুদ্ধে একটি অভ্যুত্থান ঘটান। অভ্যুত্থানটি প্রাথমিক ভাবে সফলও হয়। কিন্তু তার স্থায়িত্ব ছিল মাত্র ৩ দিন। আসলে খালেদ মোশাররফ রক্তপাত এড়িয়ে বিদ্রোহ সফল করার চেষ্টা করেছিলেন বলেই পরবর্তীতে সেটা তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়।
৩রা নভেম্বরের অভ্যুত্থানে জেনারেল খালেদ মোশাররফ রক্তপাতহীন ক্যু করতে গিয়ে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে তার নিজ বাসভবনে গৃহবন্দী করেন। তখন কর্নেল (অবঃ) আবু তাহের নারায়ণগঞ্জ অবস্থান করছিলেন। কর্নেল তাহের ছিলেন জিয়াউর রহমানের একজন বিশেষ শুভাকাংখী। তিনি সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী ছিলেন। সৈনিক-অফিসার বৈষম্য তার পছন্দ ছিলনা। তার এই নীতির জন্য তাহের সেনাবাহিনীর সাধারণ সৈনিকদের মাঝেও দারুণ জনপ্রিয় ছিলেন। কর্নেল তাহের বিশ্বাস করতেন জিয়াও তারই আদর্শের লোক।
জিয়া তার বাসভবনে বন্দী হয়ে থাকেন। খালেদ মোশারফের নির্দেশে তাকে বন্দী করে রাখেন তরুণ ক্যাপ্টেন হাফিজুল্লাহ। জিয়ার বাসার টেলিফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। কিন্তু ক্যাপ্টেন হাফিজুল্লাহ একটি ভুল করেন। তিনি ভুলে যান বেডরুমেও একটি টেলিফোন আছে। জিয়া কৌশলে বেডরুম থেকে ফোন করেন তাহেরকে। খুব সংক্ষেপে বলেন “সেভ মাই লাইফ”।
তাহের জিয়ার আহ্বানে সাড়া দেন। তিনি ঢাকাতে তার অনুগত ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সিপাহীদের পাল্টা প্রতিরোধ গড়ার নির্দেশ দিয়ে নারায়ণগঞ্জ চাষাড়া থেকে ঢাকা রওনা হন, এ সময় তার সফর সঙ্গী ছিল শত শত জাসদ কর্মী। কর্নেল তাহেরের এই পাল্টা অভ্যুত্থান সফল হয় ৭ই নভেম্বর। কর্নেল তাহের, জিয়াউর রহমানকে বন্দী দশা থেকে মুক্ত করে নিয়ে আসেন। ঐ দিনই পাল্টা অভ্যুত্থানে ইষ্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈন্যরা জেনারেল খালেদ মোশাররফকে হত্যা করে।
কথা ছিল, জিয়াউর রহমানকে ক্যান্টনমেন্ট থেকে বের করে আনা হবে। তারপর জাসদের অফিসে তাকে এনে তাহেরদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলা হবে। পরে সিপাহী-জনতার এক সমাবেশ হবে। সেখানে বক্তব্য রাখবেন জিয়া আর তাহের। কিন্তু মুক্ত হওয়ার পরে পরিস্থিতি পাল্টে যায়। জিয়া ক্যান্টনমেন্ট থেকে বের হতে সম্মত হন না। উর্ধ্বতন সামরিক অফিসাররা তাকে পরামর্শ দিতে থাকেন। তাহের জিয়াকে ভাষণ দিতে বলেন। জিয়া ভাষণ দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
তাহের বুঝতে পারেন জিয়া তাদের সাথে বেঈমানি করেছে। অন্যদিকে জিয়া বুঝতে পারেন, ক্ষমতায় টিকতে হলে তাহেরসহ জাসদকে সরাতে হবে। সেই প্লান অনুযায়ী গ্রেফতার হতে থাকে জাসদের সব নেতারা। তাহেরও গ্রেফতার হন। শুরু হয় এক প্রহসনের এক বিচার। গোপন আদালতে চলে সেই বিচার।
১৯৭৬ সালের ২১শে জুলাই কর্নেল তাহেরের ফাঁসি হয়। অন্যান্য নেতাদের বিভিন্ন মেয়াদের জেল হয়। অথচ ৭ নভেম্বরের বিপ্লবের মাধ্যমে জিয়ার জীবন বাঁচান তাহের। যার তার ফলে রাষ্ট্র ক্ষমতায় বসেন জিয়া।
সেসময় অনেকেই ভেবেছিল জিয়া রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে বেশিদিন টিকতে পারবেন না। কারণ, সেনাবাহিনীতে তার শত্রু ছিল নানা ভাগে বিভক্ত। রাজনৈতিক মাঠেও আওয়ামীলীগ, জাসদ ও কমিউনিস্ট পার্টি তখন বেশ শক্তিশালী ছিল মাঠ পর্যায়ে। কিন্তু জিয়াউর রহমান চৌকসভাবে তার পথের কাঁটা সরিয়েছিলেন। সফলভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করেছিলেন। তবে তার আমলে আওয়ামীলীগকে অতিরিক্ত কোণঠাসা রাখার চেষ্টা ছিল বলে, তাকেও শেখ মুজিব বিরোধী হিসেবে সাক্ষ্য দেয় ইতিহাস। শুধু তাই নয়, তাকে শেখ মুজিব হত্যাকান্ডের অন্যতম গোপন নায়ক হিসেবে অভিহিত করা হয়। যদিওবা জীবদ্দশায়, সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়া কখনো শেখ মুজিবকে নিয়ে কটূক্তি করেননি। অন্যদিকে তিনি মুজিব হত্যার অন্তরায় ইনডেমনিটি বিল বাতিল না করে মুজিব হত্যার আত্ম স্বীকৃত খুনিদের বড় বড় সরকারী চাকরি সহ নানা সুবিধা দান করেছিলেন। তাই মেজর জিয়া ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণাপত্র পাঠ করে সাড়া জাগানো মুক্তিযোদ্ধা এবং স্বাধীনতার যুদ্ধে জেড ফোর্সের প্রধান হয়েও তিনি জীবদ্দশায় নিজেকে নিয়ে দ্বন্দ সৃষ্টি করে গেছেন- তিনি আসলে কোন পক্ষ? তিনি কি আসলে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ? নাকি তিনি মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের লোক!
এই দ্বন্দ আরো জোড়ালো হয়, তার গঠিত দল বিএনপিতে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী নেতাদেরকে পদায়ন, মন্ত্রী সভা ও সংসদে ঠাই দেয়া। এখনো বিএনপি তাদের জোটে বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিরোধী দল জামায়াত ইসলামীকে সাথে রাখায় জিয়া প্রেসিডেন্ট হওয়ার পরে এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ছিলেন নাকি বিপক্ষের লোক ছিলেন তা নিয়ে বিতর্ক থেকেই গেছে।
লেখকঃ সম্পাদক, ডেইলি মিরর ( বাংলা)